কমছে ইলিশ আহরণ, সামনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৩ বার
কমছে ইলিশ আহরণ, সামনে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের নদী, মোহনা ও উপকূলীয় জলসীমায় একসময় যে ইলিশের প্রাচুর্য ছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্রে ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই ইলিশ আহরণে বড় ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতার তথ্য সামনে এসেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইলিশ আহরণ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে আগের অর্থবছরের মোট উৎপাদনও পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে টানা কয়েক বছর ধরে ইলিশ উৎপাদন কমার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

দেশের মানুষের কাছে ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি সম্পদ। নদীর জেলে থেকে শুরু করে আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, বরফকলের কর্মী, মাছ ব্যবসায়ী এবং খুচরা বিক্রেতা—ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবিকা। তাই নদী ও সাগরে ইলিশের উপস্থিতি কমে যাওয়ার অর্থ শুধু বাজারে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বড় জনগোষ্ঠীর আয় ও জীবনযাত্রার ওপরও এর প্রভাব পড়ে।

মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ইলিশ উৎপাদনের দীর্ঘদিনের ঊর্ধ্বমুখী ধারা ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ওই অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টন। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা ছিল পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার টন। অর্থাৎ একসময় ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বাড়ছিল। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরের পর থেকে সেই ধারায় পরিবর্তন আসে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন কমে দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ লাখ ২৯ হাজার টনে। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে তা আরও কমে প্রায় পাঁচ লাখ টনের কাছাকাছি নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব এখনও সম্পন্ন হয়নি। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরও উৎপাদন পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে গেছে। এর সঙ্গে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম আহরণের হিসাব যুক্ত হওয়ায় ইলিশের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

অথচ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের ইলিশ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ২০০১-০২ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় দুই লাখ টন। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় দুই লাখ ৯৫ হাজার টনে পৌঁছায়। এরপর উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয় প্রায় চার লাখ ৯৬ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো উৎপাদন পাঁচ লাখ টনের সীমা অতিক্রম করে। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৩২ হাজার টন, ২০১৯-২০ সালে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন এবং ২০২০-২১ সালে পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধিই ২০২২-২৩ সালে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টনে গিয়ে পৌঁছায়।

গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। নদী ও মোহনায় নাব্য কমে যাওয়া, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিরিক্ত মাছ আহরণ এবং ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার—এসব কারণে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন ও চলাচল ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে ছোট আকারের ইলিশ ধরা হলে পরবর্তী সময়ে প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে মাছ এলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ইলিশ নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতায় বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগের। তাঁর মতে, প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অতিরিক্ত আহরণ এবং ছোট ইলিশ ধরা উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ হতে পারে। এ কারণে শুধু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করাই নয়, ইলিশের চলাচল, প্রজনন, খাদ্যচক্র ও নদী-সাগরের পরিবেশ নিয়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে মা ইলিশ রক্ষায় আবারও দেশব্যাপী ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে যাচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে। একই সময়ে ইলিশ পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ থাকবে। মা ইলিশ সংরক্ষণে প্রতিবছর অক্টোবর মাসে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। চলতি বছরের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রেস রিলিজেও নিশ্চিত করা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার সময় নদী ও উপকূলীয় এলাকার জেলেদের জীবনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। অনেক পরিবারের প্রধান বা একমাত্র আয়ের উৎস মাছ ধরা। ফলে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এবারও নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের ভিজিএফ খাদ্য সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে নিষেধাজ্ঞার সময়টুকুতে জেলে পরিবারগুলোর ন্যূনতম খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে মা ইলিশ রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রধান প্রজনন এলাকাগুলোতে নজরদারি ও অভিযান জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বরিশাল, চাঁদপুর ও ভোলাসহ ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ বিচরণ ও প্রজনন এলাকায় অবৈধ মাছ ধরা ঠেকাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত তৎপরতার প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু নদীতে অভিযান চালালেই অবৈধ আহরণ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। অবৈধভাবে ধরা মাছ যাতে বাজারে পৌঁছাতে না পারে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। এ কারণে বরফকল, আড়ত, পরিবহনব্যবস্থা ও স্থানীয় বাজারগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। চাঁদপুর মোহনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্রে অবৈধ জাল অপসারণেও অভিযান জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুও উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে উল্টো আমদানির প্রয়োজন তৈরি হওয়া উদ্বেগের বিষয়। উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।

ইলিশ উৎপাদনের বর্তমান পরিস্থিতি তাই সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। শুধু একটি মৌসুমে বেশি মাছ পাওয়ার লক্ষ্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের সহায়তা, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ, ছোট ইলিশ ধরা বন্ধ, নদী ও মোহনার পরিবেশ রক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে গুরুত্ব পেলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইলিশের সঙ্গে বাংলাদেশের নদী ও মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। নদীর ঘাটে নৌকার অপেক্ষা, ভোরের বাজারে সদ্য ধরা মাছ, জেলের পরিবারের দিনের আয়—সবকিছুর সঙ্গে এই মাছের উপস্থিতি জড়িয়ে আছে। সেই ইলিশের উৎপাদন যদি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তার প্রভাব বাজার ছাড়িয়ে নদীপাড়ের মানুষের জীবনেও পড়বে। তাই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে কার্যকর করা কতটা সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত