প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের সাত নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন এই রায়কে বিএনপি সরকারের অপরাধের বিচারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরির অভিযোগ তুলে দাবি করেছেন, কাদেরসহ সাত নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের মধ্য দিয়ে সেই ন্যারেটিভের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে রাশেদ খাঁন এসব মন্তব্য করেন। তার বক্তব্য মূলত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্ককে কেন্দ্র করে। তবে জামায়াত বা এনসিপির পক্ষ থেকে রাশেদ খাঁনের এই বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে কাদের ছাড়াও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের মৃত্যুদণ্ডের কথা জানানো হয়। আদালতের রায় অনুযায়ী সাত আসামিই পলাতক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে রায়ের পর বলা হয়, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে।
রাশেদ খাঁন তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে দাবি করেন, জামায়াত ও এনসিপি বিএনপি সরকার গণহত্যার বিচার করবে না—এমন একটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা ন্যারেটিভ তৈরি করেছিল। তার মতে, কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায় বিএনপি সরকারের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ওই বক্তব্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তিনি এটিকে সরকারের ঘোষিত অপরাধবিরোধী নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তার পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নামও উল্লেখ করা হয়। রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, জামায়াতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের জন্য সাধারণ ক্ষমার অবস্থান নেওয়া হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে গণহত্যার বিচারের প্রশ্নে দলটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, জামায়াত মুখে গণহত্যার বিচারের কথা বললেও রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে আক্রমণ করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
তবে রাশেদ খাঁনের এসব বক্তব্য তার রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যাখ্যার অংশ। জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপির অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য এবং বিচারিক রায়ের বিষয়গুলো পৃথকভাবে দেখা জরুরি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক রায়টি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও সহিংসতার সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলা চলছে। এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
নতুন রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে আন্দোলন দমন, হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বিচার করা হয়। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত অভিযোগে আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং বিভিন্ন সময়ে দেওয়া নির্দেশ ও বক্তব্যের বিষয় তুলে ধরা হয়।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে তার কথিত নির্দেশ, উসকানি, সহায়তা ও সম্পৃক্ততার বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছিল। প্রসিকিউশন এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে দায়ী করার আবেদন জানায়। আদালত শুনানি ও উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে মামলার রায় ঘোষণা করেছে।
রায়ে শুধু মৃত্যুদণ্ডই নয়, কয়েকজন আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও রায়ে বলা হয়েছে।
রায়ের পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশন দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর আদালতে অভিযোগ উপস্থাপন করেছিল বলেও তিনি জানান।
এদিকে রাশেদ খাঁন তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ও পুরো প্রসিকিউশন টিমকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তার মতে, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং আদালতে তা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
রাশেদ খাঁনের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের রায়কে যুক্ত করা। তিনি দাবি করেছেন, বিএনপি সরকার অপরাধের বিচারে কোনো ছাড় না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। তবে একটি বিচারিক রায়ের আইনগত ভিত্তি এবং কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি বা রাজনৈতিক বক্তব্য—এই দুই বিষয়কে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ট্রাইব্যুনালের রায় আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত, আর কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি বা বক্তব্য রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়।
অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপিকে ঘিরে রাশেদ খাঁনের যে রাজনৈতিক মন্তব্য, তারও আলাদা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের বিচার, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে একটি বিচারিক রায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য সামনে আসা স্বাভাবিক হলেও সেসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর এখন মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াও আলোচনায় থাকবে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সবাই পলাতক থাকায় রায়ের বাস্তবায়নসহ পরবর্তী আইনি বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। একই সঙ্গে রায়ের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার বা আপিলের সুযোগ রয়েছে কি না এবং তা কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিও পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ঘিরে একদিকে বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যও সামনে এসেছে। রাশেদ খাঁনের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই রাজনৈতিক বিতর্কেরই অংশ। তবে বিচারিক সিদ্ধান্তের আইনগত বিষয়, প্রসিকিউশনের বক্তব্য এবং রাজনৈতিক নেতাদের মূল্যায়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রকে পৃথকভাবে বিবেচনা করলেই ঘটনাটির সামগ্রিক চিত্র আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব।