সৌরবিদ্যুতে বড় পরিকল্পনা পিডিবির, লক্ষ্য ২০৩০

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
সৌরবিদ্যুতে বড় পরিকল্পনা পিডিবির, লক্ষ্য ২০৩০

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে সারা দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। নিজস্ব অর্থায়নে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৬৮৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিভিন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠান।

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি যেসব এলাকায় গ্রিড-সংযুক্ত সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে, সেসবের জন্য প্রয়োজনীয় জমি নির্বাচনও করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ।

পিডিবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নির্ধারিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ফেনীর সোনাগাজীতে ২২২ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌর ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ চলছে। ফলে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে পিডিবির বর্তমান কার্যক্রম শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। নিজস্ব ভবন ও জমিতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজও চলছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নে পিডিবি ইতোমধ্যে ৬৮৮ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে।

চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪ হাজার ১৯৫ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। এসব প্রকল্প পিডিবির নিজস্ব ভবন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য স্থাপনায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরশক্তি থেকে পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।

পিডিবি সূত্র অনুযায়ী, কাপ্তাইয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমিতে ১৭০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে উৎপাদনে রয়েছে। চট্টগ্রাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৩০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার একটি ব্যবস্থা চলতি বছরের জুনে চালু হয়েছে। রাজশাহী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১২০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার আরেকটি ব্যবস্থা ৫ সেপ্টেম্বর থেকে চালু হয়েছে। খুলনা পাওয়ার প্ল্যান্টে ২৬৮ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও ১২ সেপ্টেম্বর চালু করা হয়েছে।

এ ছাড়া চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কয়েকটি স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে ৩০০ কিলোওয়াট-পিক, কাটাখালীতে ৭৩ কিলোওয়াট-পিক, বাঘাবাড়ী পাওয়ার স্টেশনে ৬৫ কিলোওয়াট-পিক এবং ভোলা ২২৫ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্টে ১৯০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে।

কক্সবাজার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ২৩০ কিলোওয়াট-পিক, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৩৩২ কিলোওয়াট-পিক এবং ঘোড়াশাল পাওয়ার স্টেশনের বিভিন্ন ভবনে ১ হাজার ৩০০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮৭ কিলোওয়াট-পিক, চট্টগ্রাম পাওয়ার স্টেশনে ৩৯০ কিলোওয়াট-পিক এবং দোহাজারী-কালীআইশ ১০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্টে ১২২ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ চলছে।

শিকলবাহা পাওয়ার প্ল্যান্টে ৭৫০ কিলোওয়াট-পিক, হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্টে ৮৬ কিলোওয়াট-পিক এবং ঘোড়াশাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১৭০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও এই উদ্যোগের আওতায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে পিডিবির বিভিন্ন স্থাপনার অব্যবহৃত ছাদকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন অব্যবহৃত ছাদ ও জমিতে নিজস্ব অর্থায়নে এসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হবে। তার মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জলবায়ু সংক্রান্ত অঙ্গীকার পূরণে সহায়তা মিলবে। একই সঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ বাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও গুরুত্ব পেয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌরশক্তি এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য একটি উৎস, বিশেষ করে বাংলাদেশের বিস্তৃত ছাদ ও অনাবাদি জমিকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকায়।

তবে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি, গ্রিড সংযোগ, প্রকল্প ব্যয়, প্রযুক্তি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ সুষ্ঠুভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। পিডিবির চলমান পরিকল্পনায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, জমি নির্বাচন ও প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং গ্রিডের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোতে এসব ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে পিডিবি একই সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা আরও বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজে লাগতে পারে।

২০৩০ সালের মধ্যে ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা তাই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে। পাশাপাশি পিডিবির নিজস্ব স্থাপনায় ছোট ও মাঝারি আকারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও দৃশ্যমানভাবে বাড়তে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টিও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বিস্তার ঘটলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে।

এখন মূল বিষয় হলো পরিকল্পিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগোয়। রামপাল ও সোনাগাজীর বড় প্রকল্পসহ বিভিন্ন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চালু করা গেলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ক্ষেত্রে পিডিবির সক্ষমতা আরও বাড়বে। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন, নির্মাণ ও গ্রিড সংযোগ—প্রতিটি ধাপেই ধারাবাহিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। এর সফল বাস্তবায়ন দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির ভূমিকা আরও দৃঢ় করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত