প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঝিনাইদহের শৈলকুপায় নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় বিষধর সাপের কামড়ে মরিয়ম খাতুন নামে সাত বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার ভোররাতে উপজেলার ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের হরিহরা গ্রামে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পারার আগেই শিশুটির শরীরে বিষের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। পরে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ঘটনাটি পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
মরিয়ম খাতুন উপজেলার পুরাতন বাখরবা গ্রামের সজিব হোসেনের মেয়ে। কয়েক দিন আগে মায়ের সঙ্গে সে হরিহরা গ্রামে নানাবাড়িতে বেড়াতে যায়। সেখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর সোমবার রাতে খাবার খেয়ে মায়ের পাশেই একই ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে শিশুটি। স্বাভাবিকভাবেই রাতটি শুরু হলেও গভীর রাতে ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনা।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের কোনো একসময় ঘুমের মধ্যেই একটি বিষধর সাপ মরিয়মকে কামড় দেয়। তখন ঘরে থাকা কেউ বিষয়টি টের পাননি। শিশুটিও ঘুমন্ত থাকায় সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। ফলে সাপের কামড়ের পরও বেশ কিছু সময় বিষয়টি পরিবারের অজানাই থেকে যায়।
ভোররাতের দিকে মরিয়মের শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করে। শরীরে তীব্র অস্বস্তি ও যন্ত্রণা অনুভব করে সে কান্না শুরু করে। একপর্যায়ে স্বজনরা তার শরীর ও পায়ে সাপের কামড়ের চিহ্ন দেখতে পান। তখন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সময় নষ্ট না করে শিশুটিকে দ্রুত শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর জরুরি বিভাগে শিশুটির চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসকেরা তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্য একটি প্রতিবেদনে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. এহতেশাম শহিদ জানিয়েছেন, শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। শরীরে কালাচ সাপের কামড়ের দুটি চিহ্ন দেখা যায় এবং তাকে অ্যান্টিভেনমও দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাপের কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষধর সাপের বিষ শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে রোগীর অবস্থা অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। মরিয়মের ক্ষেত্রেও হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই বিষের প্রভাব উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
মরিয়মের মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে শিশুটি মায়ের সঙ্গে কয়েক দিনের জন্য নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল, সেই শিশুকেই শেষ পর্যন্ত নিথর অবস্থায় বাড়ি ফিরতে হয়েছে। একটি পরিবারের কাছে এমন ঘটনা শুধু একজন সদস্যকে হারানোর বেদনা নয়, বরং হঠাৎ ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনার সামনে অসহায় হয়ে পড়ার নির্মম অভিজ্ঞতাও।
গ্রামাঞ্চলে বর্ষাকাল ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে সাপের চলাচল বাড়তে পারে। বাড়ির আশপাশে ঝোপঝাড়, কাঠের স্তূপ, গর্ত কিংবা অপরিষ্কার জায়গায় সাপ আশ্রয় নিতে পারে। রাতের বেলায় ঘরের ভেতরেও সাপ ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে মাটির কাছাকাছি ঘুমানো বা পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া শোয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। একই সঙ্গে ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখা, ঝোপঝাড় ও আবর্জনা সরিয়ে রাখা এবং রাতে চলাচলের সময় পর্যাপ্ত আলো ব্যবহার করাও প্রয়োজন। তবে কোনো ব্যক্তিকে সাপে কামড় দিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
সাপে কাটার পর গ্রামাঞ্চলে কখনো কখনো ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করার প্রবণতা দেখা যায়। এতে চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মরিয়মের ঘটনাতেও হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় তার অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। ফলে সাপের কামড়কে সাধারণ ঘটনা হিসেবে না দেখে জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের মতে, সাপে কামড়ানোর পর আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে রোগীকে শান্ত ও স্থির রাখতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া কমাতে হবে। কামড়ের স্থান কেটে দেওয়া, বিষ মুখ দিয়ে টেনে বের করার চেষ্টা কিংবা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয় এমন কোনো পদ্ধতিতে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক হতে পারে। হাসপাতালে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম ও অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
শৈলকুপায় মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনাটি আবারও গ্রামীণ জনপদে সাপের কামড়ের ঝুঁকি এবং দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি। রাতে শিশু কোথায় ঘুমাচ্ছে, ঘরের আশপাশের পরিবেশ কেমন এবং শোয়ার জায়গা নিরাপদ কি না—এসব বিষয়ে সচেতনতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
মরিয়মের মতো একটি শিশুর মৃত্যু পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কয়েক দিনের জন্য মায়ের সঙ্গে নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে তার জীবনের এমন আকস্মিক পরিণতি স্বজনদের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের কাছেও ঘটনাটি সতর্কতার বার্তা হিসেবে এসেছে। সাপের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা, ঘরের পরিবেশ নিরাপদ রাখা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সাপে কাটার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।