গ্রিনল্যান্ডে দুই সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন উপস্থিতি বাড়ছে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
গ্রিনল্যান্ডে দুই সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন উপস্থিতি বাড়ছে

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ানোর অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে আরও দুটি সামরিক স্থানে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে একটি স্নায়ুযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত পুরোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আবার চালু করা হবে এবং অন্যটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে হতে যাওয়া একটি নতুন নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র জানিয়েছে।

পরিকল্পিত দুটি স্থান হলো দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নারসারসুয়াক এবং পূর্ব উপকূলের মেস্টারসভিগ। নারসারসুয়াকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে ব্লুই ওয়েস্ট ওয়ান নামে পরিচিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ১৯৫০-এর দশকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘাঁটি বন্ধ হওয়ার পর এলাকাটির জনসংখ্যা ধীরে ধীরে কমে বর্তমানে কয়েক ডজনে নেমে এসেছে। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ কয়েক দশক পর সেখানে আবার মার্কিন সামরিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

অন্যদিকে মেস্টারসভিগ গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলের একটি প্রত্যন্ত সামরিক স্থাপনা। বর্তমানে সেখানে ডেনমার্কের সিরিয়াস ডগ স্লেড প্যাট্রোল কার্যক্রম পরিচালনা করে। ডেনিশ বিশেষ বাহিনীর এই ইউনিট দুর্গম ও তীব্র শীতপ্রধান এলাকায় কুকুরে টানা স্লেজ ব্যবহার করে টহল দেয় এবং গ্রিনল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন চুক্তির আওতায় এই স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের নতুন নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করার কথা রয়েছে। তবে স্বাক্ষরের আগে পর্যন্ত চুক্তিটির বিস্তারিত বিষয় প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুক্তির কিছু বিষয় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকতে পারে। ফলে নতুন দুটি স্থাপনায় কতসংখ্যক মার্কিন সেনা থাকবে, কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে কিংবা স্থাপনাগুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব কী হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

ডেনমার্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের দ্বিপক্ষীয় দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ন্যাটোর বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আর্কটিক নিরাপত্তা আরও সমন্বিতভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হবে। ন্যাটোর পক্ষ থেকেও চুক্তিটিকে আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা জোরদারের পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সামরিক কিংবা অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। বিশেষ করে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান ঘিরে ন্যাটোর মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন, কোপেনহেগেন ও নুকের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়।

গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক অবস্থানও এ আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দ্বীপটি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হলেও এর নিজস্ব সরকার রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার প্রশ্নটি সেখানে রাজনৈতিক আলোচনার অংশ। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তারা এর আগে জোর দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর কোনো চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর করা হবে না। নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানকে সম্মান করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিরাপত্তা হিসাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত এই বিশাল দ্বীপটি উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলে বরফের বিস্তার ও নৌপথের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ায় অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটোর দেশগুলো আর্কটিক এলাকায় নজরদারি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং সামরিক অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ছিল অনেক বড়। তখন দ্বীপটিতে ১৭টি সামরিক স্থাপনা ছিল এবং সেখানে ১০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর সামরিক স্থাপনা হিসেবে পিটুফিক স্পেস বেসই প্রধান ঘাঁটি, যেখানে প্রায় ১৫০ জন মার্কিন সামরিক সদস্য রয়েছেন। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নারসারসুয়াক ও মেস্টারসভিগে মার্কিন উপস্থিতি যুক্ত হওয়ায় কয়েক দশক পর গ্রিনল্যান্ডে ওয়াশিংটনের সামরিক পদচিহ্ন আবারও বিস্তৃত হবে।

তবে নতুন চুক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে এর পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পরিমাণ, ঘাঁটিগুলোর ব্যবহারের ধরন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্তৃত্বের কাঠামো এবং ন্যাটোর ভূমিকা—এসব বিষয় চুক্তির চূড়ান্ত ভাষার ওপর নির্ভর করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট চুক্তিটিকে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ভূমিকার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরলেও ডেনমার্ক একই ব্যবস্থাকে ন্যাটোর বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। ফলে চুক্তিটি প্রকাশের পরই এর প্রকৃত পরিধি ও ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

সব মিলিয়ে, গ্রিনল্যান্ডে দুটি সামরিক স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে উপস্থিতি আর্কটিক অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ন্যাটোর কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন পর গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের সম্ভাব্য সম্প্রসারণ তাই শুধু তিন পক্ষের একটি নিরাপত্তা চুক্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, ন্যাটোর ভূমিকা এবং গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক অবস্থানও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত