১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় দেশসেরা সাঘাটার সিয়াম

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় দেশসেরা সাঘাটার সিয়াম

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এক তরুণের সাফল্যে এখন আনন্দের আবহ। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) ১৮তম পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে দেশসেরা হয়েছেন উপজেলার আমদিরপাড়া গ্রামের সন্তান আরিফ উল করিম সিয়াম। তাঁর এই সাফল্যে পরিবার, স্বজন, শিক্ষাজীবনের সহপাঠী ও নিজ এলাকার মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে গর্ব ও আনন্দের অনুভূতি।

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে সিয়ামের প্রথম হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। কমিশনের ওয়েবসাইটে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষা, ২০২৫-এর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ পরীক্ষায় সিয়াম প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।

সিয়াম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪১তম ব্যাচের এই শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর চূড়ান্ত ফলাফলে দেশের সব পরীক্ষার্থীর মধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে সামনে এসেছে।

সিয়ামের বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার আমদিরপাড়া গ্রামে। তিনি মো. রেজাউল করিম ও আলপনা করিম দম্পতির সন্তান। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ও মেধাবী হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁর এই অর্জনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রামের মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে উৎসাহ ও আনন্দ।

সিয়ামের ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে শিক্ষিত ও পেশাজীবী পরিবেশ। তাঁর স্ত্রী ডা. তবিবা আজিজ পেশায় একজন চিকিৎসক। পরিবার থেকে পাওয়া উৎসাহ এবং নিজের লক্ষ্য ধরে রাখার মানসিকতা সিয়ামের দীর্ঘ প্রস্তুতির পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তাঁর পরিচিতজনেরা মনে করেন।

দেশসেরা হওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সিয়াম তাঁর সাফল্যের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো করার চেষ্টা করেছেন এবং ফলাফলকে সৃষ্টিকর্তার দান হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই নিজস্ব যোগ্যতা ও পরিশ্রম থাকে।

বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে সিয়ামের বক্তব্যেও উঠে এসেছে ধারাবাহিকতার গুরুত্ব। আইন বিভাগের জুনিয়র শিক্ষার্থী এবং ভবিষ্যতে এই পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহীদের তিনি ধৈর্য না হারানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘ প্রস্তুতির পথে প্রতিদিন একই ধরনের সাফল্য আসে না। কখনো প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকে, আবার কখনো ভালো অগ্রগতি হয়। তবে নিয়মিত পড়াশোনা এবং ধারাবাহিক প্রস্তুতি ধরে রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাই করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। শুধু বই পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পরীক্ষার পরিবেশে নিজেকে বারবার যাচাই করলে দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন।

সিয়ামের এই সাফল্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগেও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিভাগটির সভাপতি সাঈদা আনজু বলেন, আইন বিভাগ থেকে আবারও দেশসেরা হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগের জন্য গর্বের বিষয়। তিনি সিয়ামসহ ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ২০০ জনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের জন্যও সিয়ামের সাফল্যের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। এর আগে ১৩তম থেকে ১৬তম বিজেএস পরীক্ষায় টানা চারবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। ১৭তম পরীক্ষায় সেই ধারাবাহিকতায় বিরতি এলেও ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় আবারও শীর্ষস্থান দখল করেছেন রাবির আইন বিভাগের একজন শিক্ষার্থী।

বিজেএস পরীক্ষা বাংলাদেশের বিচার বিভাগে সহকারী জজ পদে নিয়োগের জন্য অনুষ্ঠিত একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রাথমিক ও লিখিত পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে মৌখিক পরীক্ষাসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়।

এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এর সঙ্গে তাঁর পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিজ এলাকার মানুষের আবেগও জড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার একটি পরিবারের সন্তান জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জন করলে তা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করতে পারে।

সাঘাটার আমদিরপাড়া গ্রামের মানুষও সিয়ামের সাফল্যকে নিজেদের অর্জন হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় সাংবাদিক জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই সিয়াম অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ভাষায়, সিয়ামের এই অর্জন দেশ ও জাতির কল্যাণে ভবিষ্যতে বিশেষ অবদান রাখবে বলে তাঁরা আশা করেন।

সিয়ামের সাফল্যের পেছনে যে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, তা হলো দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ্য ধরে রাখার সক্ষমতা। একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি সাধারণত কয়েক দিনের বিষয় নয়। আইন বিষয়ে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন আইন, সংবিধান, সাধারণ জ্ঞান এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তৃত প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে নিয়মিত লিখিত অনুশীলন ও পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সিয়ামের নিজের বক্তব্যেও সেই ধারাবাহিক প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি ভবিষ্যৎ পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার যে পরামর্শ দিয়েছেন, তা তাঁর নিজের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতারও প্রতিফলন। প্রতিদিন সমান ভালো না গেলেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

বর্তমানে তাঁর সামনে বিচার বিভাগে পেশাজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিজেএস পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জনের পর একজন মেধাবী আইন শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর কাছে প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। তবে বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, পেশাগত সততা, আইন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায়িত্বশীলতারও প্রয়োজন হবে।

সিয়ামের সাফল্যের খবর তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি সাঘাটার একটি গ্রামের পরিবার থেকে উঠে আসা একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার স্বীকৃতি হিসেবেও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি নতুন করে আত্মবিশ্বাসের উপলক্ষ তৈরি করেছে।

একজন শিক্ষার্থীর এমন সাফল্য পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভুগতে পারে। সিয়ামের মতো উদাহরণ তাদের দেখাতে পারে যে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, নিয়মিত প্রস্তুতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করলে বড় প্রতিযোগিতায়ও সাফল্য অর্জন সম্ভব।

১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সিয়ামের প্রথম স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়েছে। সামনে শুরু হবে দায়িত্ব ও পেশাগত জীবনের নতুন অধ্যায়। সাঘাটার আমদিরপাড়া থেকে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই সাফল্যে পৌঁছানো সিয়ামের গল্প এখন তাঁর নিজ এলাকার পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও ভবিষ্যৎ বিজেএস পরীক্ষার্থীদের কাছেও অনুপ্রেরণার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত