৭ ইসলামী দলের ঐক্যে ২৪ সদস্যের কমিটি গঠন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
৭ ইসলামী দলের ঐক্যে ২৪ সদস্যের কমিটি গঠন

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দলের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নতুন ধাপে পৌঁছেছে। পারস্পরিক মতপার্থক্য দূর করে একটি সমন্বিত রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ২৪ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সাত দলের ঐক্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকায় সেগুলো আরও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন এই কমিটিকে।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরী মাদরাসায় সাত দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। বৈঠকে অংশ নেওয়া দলগুলোর প্রতিনিধিরা নিজেদের অবস্থান ও প্রস্তাব তুলে ধরেন এবং ঐক্যের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। দীর্ঘদিন ধরে এসব দলের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে যোগাযোগ থাকলেও এবার একটি সমন্বিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিষয়ে আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকের আগে সাত দলের কাছ থেকে ঐক্যের রূপরেখা নিয়ে পৃথক প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়। সেসব প্রস্তাব পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের জন্য হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি কাজ করে। ওই উপকমিটির আলোচনার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়। রোববারের বৈঠকে মূলত সেই খসড়া নিয়ে সাত দলের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হয়।

বৈঠকে দলগুলোর প্রতিনিধিরা নিজ নিজ দলের অবস্থান তুলে ধরেন। আলোচনায় ঐক্যের কাঠামো, নেতৃত্বের পদ্ধতি এবং ভবিষ্যতে দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় কীভাবে হবে—এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। তবে সব বিষয়ে একই মত পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে সাতদলীয় ঐক্যের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব কে হবেন, নেতৃত্বের মেয়াদ শেষে পরিবর্তনের পদ্ধতি কী হবে এবং কোনো দল অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকলে বা ভবিষ্যতে নতুন কোনো জোটে যুক্ত হতে চাইলে তার ক্ষেত্রে কী ধরনের শর্ত প্রযোজ্য হবে—এসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

এই মতপার্থক্যকে ঐক্য প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একাধিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি করতে গেলে প্রত্যেক দলের নিজস্ব সাংগঠনিক অবস্থান, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল সমন্বয় করা প্রয়োজন হয়। সে কারণেই তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না গিয়ে আরও আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

২৪ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী সাতটি দল থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি নিয়ে কমিটিতে ২১ জন থাকার কথা। এর সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের আরও দুজন নেতাকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানের নামও আলোচনায় এসেছে।

সাত দলকে আগামী দুই দিনের মধ্যে তাদের প্রতিনিধিদের নাম হেফাজতে ইসলামের মহাসচিবের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে। এরপর কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবে। প্রাথমিকভাবে আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

এ উদ্যোগের পেছনে মূল লক্ষ্য হিসেবে সামনে এসেছে রাজনৈতিকভাবে কাছাকাছি অবস্থান থাকা দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। আলাদা আলাদা সাংগঠনিক পরিচয় বজায় রেখেও অভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে সমন্বিত অবস্থান তৈরি করা যায় কি না, সেটি নিয়েই মূলত আলোচনা এগোচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে এই ঐক্য কী ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো নেবে এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে এর প্রভাব কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়।

ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের আলোচনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো অভিন্ন কর্মসূচি ও রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু দলগুলোর নেতৃত্ব, নির্বাচনী কৌশল, সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক জোট নিয়ে ভিন্ন অবস্থানের কারণে অনেক উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এবার সাত দলের উদ্যোগ কতটা কার্যকর কাঠামোয় রূপ নেয়, সেটি নির্ভর করবে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্যগুলো কতটা সমাধান করা যায় তার ওপর।

বর্তমান উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরাসরি চূড়ান্ত ঐক্যের ঘোষণা না দিয়ে আলোচনার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক সমন্বয় কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে দলগুলোর মতামত পর্যালোচনা, বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এবং একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করা হবে। এর ফলে প্রত্যেক দলের প্রতিনিধিদের আলোচনায় সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বৈঠকে দলগুলোর প্রতিনিধিরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন এবং ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে কিছু বিষয়ে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন থাকায় লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের সংশ্লিষ্ট নেতারাও জানিয়েছেন, ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করার জন্য আরও আলোচনা প্রয়োজন।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাত দলের রাজনৈতিক ঐক্যকে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। বরং এটি একটি চলমান আলোচনা ও সমন্বয় প্রক্রিয়া। ২৪ সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তাদের আলোচনার পর কী ধরনের চূড়ান্ত কাঠামো দাঁড়াবে, সেটি নির্ভর করবে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে দলগুলোর সম্মতির ওপর।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের দিক থেকেও উদ্যোগটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাতটি দলের সম্মিলিত রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হলে ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের সমন্বিত কর্মকৌশল দেখা যেতে পারে। তবে সেটি নির্বাচনী জোট, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নাকি অন্য কোনো ধরনের সমন্বিত কাঠামো হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তাই বর্তমান পর্যায়ে সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে অনুমানের চেয়ে আলোচনার অগ্রগতি ও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকে নজর দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক স্বার্থের সঙ্গে অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সামঞ্জস্য করা। নেতৃত্বের রোটেশন, জোটের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে ঐক্যের কাঠামো চূড়ান্ত করা কঠিন হতে পারে।

ফটিকছড়ির বৈঠকের পর এখন সেই দায়িত্ব মূলত লিয়াজোঁ কমিটির ওপর পড়েছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে প্রতিনিধিদের নাম জমা দেওয়ার পর কমিটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। এরপর নির্ধারিত বৈঠকগুলোতে মতপার্থক্যের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরির চেষ্টা হবে।

সাত ইসলামী দলের এই উদ্যোগ সফলভাবে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ নেয় কি না, তার উত্তর এখনো সময়ের অপেক্ষায়। তবে ২৪ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত ঐক্য প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার আরও একটি পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সামনে দলগুলোর আলোচনার ফলাফলই নির্ধারণ করবে, দীর্ঘদিনের পৃথক রাজনৈতিক পথচলা কতটা সমন্বিত কাঠামোর দিকে এগোয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত