কক্সবাজার বিমানবন্দরে নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২০ বার
কক্সবাজার বিমানবন্দরে নতুন টার্মিনালে যাত্রীসেবা শুরু

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কক্সবাজারের আকাশপথে যাত্রীসেবায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক মানের নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করেই যাত্রীদের যাতায়াত শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো টার্মিনালের সীমিত পরিসর ও অতিরিক্ত যাত্রীচাপ নিয়ে যে ভোগান্তি ছিল, নতুন অবকাঠামোর কারণে তা অনেকটাই কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজারে পর্যটনের মৌসুমে বিমানবন্দরে যাত্রীদের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছুটির দিন, সরকারি ছুটি কিংবা পর্যটন মৌসুমে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রী বিমানবন্দরে উপস্থিত হলে পুরোনো টার্মিনালের সীমিত জায়গায় তৈরি হতো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের বসার জায়গার সংকট, চেক-ইন কাউন্টারে ভিড় এবং সামগ্রিক চলাচলে চাপের কারণে অনেক সময় যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হতো। নতুন টার্মিনালের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে সেই বাস্তবতায় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (এটিএম) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম জানিয়েছেন, পুরোনো টার্মিনালে একটি ফ্লাইটে ৪০০ থেকে ৫০০, কখনো কখনো সাড়ে ৫০০ যাত্রী পর্যন্ত হয়ে যেত। ফলে টার্মিনালের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতো। নতুন টার্মিনাল চালু হওয়ায় এই চাপ সামাল দেওয়া সহজ হবে বলে তিনি মনে করছেন। তবে আপাতত এটি পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।

নতুন টার্মিনালকে শুধু বড় একটি ভবন হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক যাত্রীসেবা ও বিমানবন্দর পরিচালনার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো বাস্তবে যাত্রী ও ফ্লাইট পরিচালনার সময় কোনো ধরনের কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত কিংবা সমন্বয়সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয় কি না, তা শনাক্ত করা। প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে সেসব সমস্যা সমাধানের সুযোগও থাকবে।

প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৫ বর্গমিটার আয়তনের নতুন আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার। যাত্রীদের ইমিগ্রেশন কার্যক্রমের জন্য রাখা হয়েছে ১০টি ডেস্ক। লাগেজ ব্যবস্থাপনায় রয়েছে দুটি আধুনিক ব্যাগেজ ক্লেইম বেল্ট। নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে সাতটি স্ক্যানার, মেটাল ডিটেকশন ব্যবস্থা এবং হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের পৃথক সুবিধা।

যাত্রীদের চলাচল আরও সহজ করতে টার্মিনালে রয়েছে চারটি এসকেলেটর ও ছয়টি লিফট। পাশাপাশি বোর্ডিং ব্রিজ এবং আধুনিক লাগেজ হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে বিমানবন্দরে প্রবেশের পর চেক-ইন থেকে শুরু করে নিরাপত্তা পরীক্ষা, অপেক্ষা এবং বিমানে ওঠার বিভিন্ন ধাপ আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, নতুন টার্মিনালে বছরে প্রায় ২০ লাখ যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা রাখা হয়েছে। বিদেশি বিভিন্ন সরঞ্জামের টেস্টিং ও কমিশনিংয়ের কাজও ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহারের আগে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবস্থা যাচাই করে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্টরাও। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশন) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, নতুন টার্মিনালে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। এটি শুধু একটি এয়ারলাইন্সের জন্য নয়, বরং কক্সবাজার বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী সব এয়ারলাইন্সের জন্যই ইতিবাচক পরিবর্তন। নতুন অবকাঠামোর ফলে যাত্রীরা আগের তুলনায় উন্নত সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়নকে দেশের পর্যটন খাতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বড় একটি অংশ আকাশপথে যাতায়াত করেন। বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা যত বেশি আরামদায়ক ও কার্যকর হবে, পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারী, বয়স্ক যাত্রী এবং শিশুদের সঙ্গে যাতায়াতকারীদের জন্য অপেক্ষার জায়গা, চলাচলের সুবিধা ও লাগেজ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নতুন টার্মিনালে যাতায়াত শুরু করা কয়েকজন যাত্রীও তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ঢাকার যাত্রী রাকিব হাসানের ভাষ্য, পুরোনো টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় এত বেশি হয়ে যেত যে অনেক সময় দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়াও কঠিন ছিল। নতুন টার্মিনালটি তুলনামূলকভাবে অনেক বড় এবং সেখানে যাত্রীদের বসা ও চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। তাঁর মতে, নিয়মিতভাবে এই ব্যবস্থা চালু থাকলে বিমানবন্দরে অপেক্ষার সময়ের অস্বস্তি অনেকটাই কমতে পারে।

নাজমা আক্তার নামে আরেক যাত্রী নতুন টার্মিনালে প্রবেশের পর আগের তুলনায় স্বস্তি অনুভব করার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, চেক-ইন কাউন্টার, বসার জায়গা এবং অন্যান্য সুবিধাগুলো তুলনামূলকভাবে গোছানো। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হলে এই অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বাড়বে বলেও তিনি মনে করেন।

সাইফুল ইসলাম নামে এক যাত্রী বলেন, একই সময়ে অনেক ফ্লাইটের যাত্রী বিমানবন্দরে উপস্থিত হলে পুরোনো টার্মিনালে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতো। নতুন টার্মিনালের প্রশস্ত জায়গা সেই চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তাঁর প্রত্যাশা, নতুন সুবিধাগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে কার্যকর রাখা হবে এবং যাত্রীদের সেবার মানও একইভাবে বজায় থাকবে।

কক্সবাজারের মতো আন্তর্জাতিক পর্যটন সম্ভাবনাময় একটি শহরের বিমানবন্দরে আধুনিক টার্মিনাল চালু হওয়াকে সময়োপযোগী পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন আরেক যাত্রী তানভীর আহমেদ। তাঁর মতে, স্থানীয় যাত্রীদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের বিমানবন্দর ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও নতুন টার্মিনালের কারণে উন্নত হতে পারে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পরিধি বাড়লে এই অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হবে বলে তিনি মনে করেন।

তবে নতুন টার্মিনাল চালু হওয়াই শেষ কথা নয়। এর পূর্ণ সুফল পেতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকর পরিচালনা এবং যাত্রীসেবার মান বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের সময় এসব বিষয় বাস্তবে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা গেলে টার্মিনালটির কার্যকারিতা আরও বাড়তে পারে।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল চালুর মধ্য দিয়ে দেশের পর্যটননির্ভর এই শহরের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলো। আপাতত পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে যাত্রী ও ফ্লাইট পরিচালনার বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে কক্সবাজারের বিমানযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ার পাশাপাশি পর্যটন খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এখন যাত্রীদের প্রত্যাশা, নতুন এই আধুনিক অবকাঠামো শুধু আকারে বড় নয়, সেবা ও ব্যবস্থাপনাতেও যেন দীর্ঘমেয়াদে সেই মান ধরে রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত