অর্থকষ্ট পেরিয়ে ভারতের চতুর্থ ধনী অভিনেতা হৃত্বিক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
অর্থকষ্ট পেরিয়ে ভারতের চতুর্থ ধনী অভিনেতা হৃত্বিক

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

একসময় যে পরিবারের কাছে বাড়িভাড়া দেওয়ার অর্থও ছিল না, সেই পরিবারের সন্তানই আজ ভারতের অন্যতম ধনী অভিনেতা। শৈশবের কঠিন আর্থিক বাস্তবতা, বাবার ব্যবসায়িক ক্ষতি, অনিশ্চয়তা এবং সংগ্রামের দিন পেরিয়ে হৃত্বিক রোশন এখন বলিউডের সফল অভিনেতাদের পাশাপাশি সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। সাম্প্রতিক এক সম্পদ তালিকা অনুযায়ী, ভারতের ধনী অভিনেতাদের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছেন তিনি।

Hurun India Rich List 2026-এর তথ্য অনুযায়ী, হৃত্বিক রোশনের আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অভিনয় থেকে পাওয়া আয় ছাড়াও ব্যবসায়িক বিভিন্ন উদ্যোগ এবং তার লাইফস্টাইল ও ফিটনেস ব্র্যান্ড HRX থেকে পাওয়া আয় তার মোট সম্পদের বড় অংশ গড়ে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার বর্তমান আর্থিক অবস্থানের সঙ্গে শৈশবের বাস্তবতার ব্যবধানটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

হৃত্বিকের জীবনের কঠিন সময়ের গল্প নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের পরিবারের সেই আর্থিক সংকটের কথা বলেছেন। ১৯৯৭ সালে ‘কয়লা’ সিনেমা নির্মাণের পর তার বাবা ও চলচ্চিত্র পরিচালক রাকেশ রোশন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। সেই সময়ের পরিস্থিতি পরিবারটির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

হৃত্বিক এক পুরোনো সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বাবার আর্থিক বিপর্যয়ের সময় তিনি তাকে কাঁদতে দেখেছিলেন। একজন সন্তানের কাছে নিজের বাবাকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখা যে কতটা কঠিন, সেই স্মৃতি তার জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে নিজের শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে হৃত্বিক বুঝিয়েছেন, তার পরিবারও একসময় এমন সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে, যখন দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল।

২০০৬ সালে সিমি গারেওয়ালের অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হৃত্বিক তার শৈশবের সেই কঠিন সময়ের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, একপর্যায়ে পরিবারের বাড়িভাড়া পরিশোধ করার মতো অর্থও ছিল না। আর্থিক পরিস্থিতির কারণে তার মা পিঙ্কি রোশন হৃত্বিক ও তার বোনকে নিয়ে নানাবাড়িতে চলে যান। অন্যদিকে রাকেশ রোশন তখন তার মায়ের সঙ্গে থাকতেন।

পরিবারের সেই সংকট কেবল অর্থের অভাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না; নতুন করে জীবন শুরু করার মতো একটি স্থায়ী পরিবেশ তৈরি করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরে পরিবার একটি বাড়িতে ওঠে। কিন্তু সেখানে শুরুতে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও ছিল না। হৃত্বিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে তখন মূলত দেয়াল ও মেঝে ছাড়া তেমন কিছুই ছিল না।

পরিবারের সদস্যদের মেঝেতে চাটাই পেতে ঘুমাতে হতো। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একে একে বাড়িতে যোগ হতে থাকে। জীবনের সেই সময়টি হৃত্বিকের কাছে কেবল অভাবের স্মৃতি ছিল না; বরং কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও পরিবার কীভাবে টিকে থাকতে পারে, সেটিরও শিক্ষা ছিল।

এরপর রাকেশ রোশন সিদ্ধান্ত নেন, ছেলেকে বলিউডের নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। সেই সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে ২০০০ সালে মুক্তি পায় হৃত্বিকের প্রথম সিনেমা ‘কাহো না… পেয়ার হ্যায়’। সিনেমাটিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন আমিশা প্যাটেল। মুক্তির পর ছবিটি ব্যাপক সাফল্য পায় এবং হৃত্বিক রাতারাতি বলিউডের আলোচিত তারকায় পরিণত হন।

হৃত্বিকের অভিষেক শুধু একটি সিনেমার সাফল্য ছিল না, এটি রোশন পরিবারের জন্যও ছিল বড় একটি ঝুঁকি। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রাকেশ রোশন জানিয়েছেন, সিনেমাটির নির্মাণ ব্যয় বাড়তে থাকায় ছবিটি শেষ করতে তাকে নিজের বাড়ি ও গাড়ি বন্ধক রাখতে হয়েছিল। অর্থাৎ হৃত্বিকের অভিষেকের পেছনেও ছিল বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি ও পারিবারিক ত্যাগ।

সিনেমাটি সফল না হলে রোশন পরিবারকে আরও বড় আর্থিক সমস্যায় পড়তে হতে পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘কাহো না… পেয়ার হ্যায়’ বক্স অফিসে সফল হয়। নতুন প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যে হৃত্বিক দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। অভিনয়, নাচ, শারীরিক গঠন এবং পর্দায় উপস্থিতির কারণে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই বলিউডের অন্যতম পরিচিত তরুণ তারকায় পরিণত হন।

অভিষেকের পর হৃত্বিক একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের অভিনয়ক্ষমতার পরিসরও বাড়ানোর চেষ্টা করেন। সময়ের সঙ্গে তারকা হিসেবে তার পারিশ্রমিক ও বাণিজ্যিক মূল্য বাড়তে থাকে। সিনেমার বাইরেও বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড অংশীদারত্ব এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড তার আয়ের ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করে।

বিশেষ করে HRX ব্র্যান্ড হৃত্বিকের ব্যবসায়িক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ফিটনেস, লাইফস্টাইল ও তরুণ প্রজন্মের জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ব্র্যান্ড তার ব্যক্তিগত পরিচিতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সক্রিয় হওয়ার ফলে তার আয়ের উৎসও বৈচিত্র্যময় হয়েছে।

বর্তমানে হৃত্বিকের সম্পদের যে হিসাব সামনে এসেছে, সেটি তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং অভিনয়ের বাইরে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আনুমানিক সম্পদ তাকে ভারতের ধনী অভিনেতাদের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে নিয়ে এসেছে বলে Hurun India Rich List 2026-এর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে একজন তারকার সম্পদের হিসাব কেবল তার ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থকে বোঝায় না। বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে মালিকানা বা অংশীদারত্ব, ব্র্যান্ডের মূল্য, বিনিয়োগ, সম্পত্তি, পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য সম্পদের মূল্যায়নও এ ধরনের তালিকায় বিবেচনায় আসতে পারে। ফলে প্রকাশিত সম্পদের পরিমাণকে আনুমানিক হিসাব হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

হৃত্বিকের গল্পের আকর্ষণ এখানেই যে তার বর্তমান অবস্থানকে শুধু বলিউডের সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলে তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাদ পড়ে যায়। ছোটবেলায় পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। বাবার চোখের জল দেখেছেন, বাড়িভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য হারানোর পরিস্থিতি দেখেছেন, ন্যূনতম আসবাববিহীন বাড়িতে বসবাস করেছেন এবং পরিবারের সদস্যদের মেঝেতে ঘুমানোর দিনও পার করেছেন।

সেই জায়গা থেকে কয়েক দশকের ব্যবধানে তার জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তিনি ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকাদের একজন, অন্যদিকে ব্যবসায়ী হিসেবেও নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন। তার সম্পদের পরিমাণ নিয়ে আলোচনা যতটা আলোড়ন তৈরি করেছে, তার শৈশবের সংগ্রামের গল্পও ততটাই মানুষের আগ্রহ তৈরি করছে।

হৃত্বিকের জীবনের এই পরিবর্তন বলিউডের সাফল্যের প্রচলিত গল্পের বাইরে আরেকটি দিক তুলে ধরে। একটি চলচ্চিত্র পরিবারের সন্তান হয়েও তার পরিবার সবসময় আর্থিক নিরাপত্তার মধ্যে ছিল না। বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ের বড় আর্থিক ক্ষতি তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছিল। সেই অভিজ্ঞতার পরই ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তৈরি হয়।

‘কাহো না… পেয়ার হ্যায়’-এর সাফল্য সেই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। এরপর অভিনয়ের ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগ হৃত্বিককে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে আসে, যেখানে তার পরিচয় কেবল চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই।

আজকের হৃত্বিক রোশন তাই শুধু সফল এক বলিউড তারকার নাম নয়; তার জীবনপথে রয়েছে আর্থিক সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি দীর্ঘ অধ্যায়। একসময় যে পরিবারের জন্য বাড়িভাড়া পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল, সেই পরিবারের সন্তানই এখন হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হিসেবে আলোচনায়। এই পরিবর্তন তার ক্যারিয়ারের সাফল্যের পাশাপাশি কঠিন সময় পেরিয়ে নতুনভাবে নিজের অবস্থান তৈরির গল্পও হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত