তথ্যের অধিকার ও অপতথ্য রোধে আজ আন্তর্জাতিক দিবস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
তথ্যের অধিকার ও অপতথ্য রোধে আজ আন্তর্জাতিক দিবস

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তথ্য জানার অধিকার নাগরিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। একটি রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসন ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অবাধ প্রবাহের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের ফলে মানুষ যেমন আগের চেয়ে দ্রুত তথ্য পাচ্ছে, তেমনি একই গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে ভুল, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য। এমন বাস্তবতায় তথ্যের অধিকার সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো এবং সঠিক তথ্যপ্রাপ্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে আজ সোমবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস।

প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস পালিত হয়। ইউনেস্কোর উদ্যোগে স্বীকৃত এ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং সরকারি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা। তথ্য পাওয়ার সুযোগ যত বাড়ে, নাগরিকদের নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগও তত বিস্তৃত হয়। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষের জানার সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রও শক্তিশালী হতে পারে।

এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্যে ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা এবং অপতথ্য মোকাবিলায় তথ্য অধিকারের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি তথ্য লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু তথ্যটি সত্য কি না, তার উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য কিংবা সেটি কোনো উদ্দেশ্যে প্রচার করা হচ্ছে কি না—এসব যাচাই করার সুযোগ অনেক সময় পাঠকের থাকে না। ফলে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা আংশিক সত্য দ্রুত জনমত ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

এই বাস্তবতায় তথ্যের অধিকার শুধু সরকারি নথি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়ার বিষয় নয়; বরং সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সঙ্গেও বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত। কোনো নাগরিক যখন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত, সেবা, প্রকল্প বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে পারেন, তখন তিনি সেই তথ্যের ভিত্তিতে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। একইভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে পাওয়া গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই করার সুযোগও তৈরি হয়।

দিবসটি উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে তথ্য কমিশন বাংলাদেশের অডিটোরিয়ামে আজ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দুপুর আড়াইটায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এ সভা। এতে তথ্য অধিকার, তথ্যের সত্যতা, অপতথ্য মোকাবিলা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থের। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানার সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আমানউল্লাহ আমান, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এবং তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।

আলোচনায় অংশ নেবেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তথ্য কমিশনের সচিব মো. শাহ আলমের। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক ড. সুমন রহমান।

দিবসটির কর্মসূচি শুধু আলোচনা সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য অধিকারবিষয়ক বার্তা পৌঁছে দিতে মোবাইল ফোনে এসএমএস প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের তথ্য অধিকার নিয়ে বিভিন্ন তথ্যচিত্র ডিজিটাল স্ক্রল ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বোর্ডে প্রচার করা হবে। সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতেও দিবস উদযাপনসংক্রান্ত ফেস্টুন প্রচারের কর্মসূচি রাখা হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও স্থানীয় পর্যায়েও দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি জানানো, তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়ার বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজব্যবস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নাগরিক যখন জানতে পারেন কোনো সরকারি অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কোনো প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিংবা কোনো জনসেবা পাওয়ার নিয়ম কী, তখন তিনি নিজের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতনভাবে প্রশ্ন তুলতে পারেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার সামাজিক চাপ তৈরি হয়।

তবে তথ্যের সহজপ্রাপ্যতার পাশাপাশি তথ্যের মান ও নির্ভরযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল যুগে তথ্যের পরিমাণ এত দ্রুত বাড়ছে যে সত্য ও মিথ্যা আলাদা করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। একটি ভুয়া ছবি, পুরোনো ভিডিও কিংবা ভুল তথ্য নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হলে মুহূর্তের মধ্যে তা ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কখনও কখনও এমন তথ্য মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি কিংবা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করতে পারে।

এ কারণে তথ্য অধিকার এবং তথ্য যাচাই—দুই বিষয়কেই পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিকদেরও তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রসার এবং অপতথ্য প্রতিরোধে সম্মিলিত সচেতনতা তৈরি হলে ডিজিটাল পরিসর আরও দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং সমাজে নির্ভরযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব নতুন করে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ। তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ মানুষের ক্ষমতায়ন বাড়ায়, আর সঠিক তথ্যের অবাধ প্রবাহ সমাজে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে তথ্য গোপনীয়তা, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি।

ডিজিটাল যোগাযোগের এই সময়ে একজন নাগরিকের হাতে তথ্য পৌঁছানো যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই তথ্যের অধিকারকে কার্যকর করতে শুধু তথ্য প্রকাশ করলেই হবে না, সেই তথ্য সহজবোধ্য, সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্যভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। আজকের দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই আবার সামনে আসছে।

মানুষের জানার অধিকার নিশ্চিত করা, সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অপতথ্যের বিস্তার ঠেকাতে সঠিক তথ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই এবারের আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস পালিত হচ্ছে। নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্যভিত্তিক সম্পর্ক যত শক্তিশালী হবে, ততই একটি দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত