বন্ধ পাটকল ফের চালু, কর্মসংস্থানের বড় লক্ষ্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ বার
বন্ধ পাটকল ফের চালু, কর্মসংস্থানের বড় লক্ষ্য

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো আবারও উৎপাদনের আওতায় আনার উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন বন্ধ পাটকলগুলো পর্যায়ক্রমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর মাধ্যমে একদিকে অব্যবহৃত শিল্পসম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে নতুন করে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, চলমান উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর দীর্ঘদিনের লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ২০২০ সালের ১ জুলাই বিজেএমসির আওতাধীন ২৫টি পাটকলের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় একসঙ্গে বহু শ্রমিক ও কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েন। বন্ধ হয়ে যায় দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম। পরে এসব মিলকে দীর্ঘমেয়াদি লিজের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

বর্তমানে ২৫টি বন্ধ মিলের মধ্যে ২০টি বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ১৪টি মিলের লিজ কার্যক্রম সম্পন্ন করে লিজগ্রহীতাদের কাছে দখল হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি মিলে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা শিল্প অবকাঠামোও ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

অবশিষ্ট মিলগুলোর মধ্যেও কয়েকটির লিজ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। চট্টগ্রামের এমএম জুট মিল, রাঙ্গুনিয়ার কেএফডি লিমিটেড এবং নরসিংদীর কো-অপারেটিভ জুট মিল লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব মিল পুনরায় উৎপাদনে ফিরলে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও গতি আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

এরই মধ্যে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর জন্য পৃথক ইজারা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস এবং খুলনার স্টার জুট মিলস ইজারা পেয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস ইজারা পেয়েছে হ্যামকো গ্রুপ। এসব মিল পুনরায় চালু হলে অন্তত ১১ হাজার ৬২৯ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে তিনটি মিলে প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং বছরে প্রায় ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকার সম্ভাব্য মোট আয় বা টার্নওভারের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের রায়পুরে অবস্থিত জাতীয় জুট মিলসে প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। মিলটি চালু হলে প্রায় ৫ হাজার ২৩৮ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলসে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানেও প্রায় ৫ হাজার ২৩৮ জনের কর্মসংস্থান এবং বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা টার্নওভারের লক্ষ্য রয়েছে।

খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলসেও বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মিলটি চালু হলে কমপক্ষে ১ হাজার ১৫৩ জনের কর্মসংস্থান হতে পারে এবং সম্ভাব্য বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বিজেএমসির কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক লোকসানে থাকা এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারার কারণেই একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এখন সেই শিল্পসম্পদকে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ের চাপ কমার পাশাপাশি অব্যবহৃত জমি, অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিকে আবার উৎপাদনমুখী করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বিজেএমসির মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, অবশিষ্ট পাঁচটি মিলের মধ্যে ডেমরার করিম জুট মিলস ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে বিডিসিএফ বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি ও আলিম জুট মিলস নিয়ে মামলা চলমান থাকায় সেগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এখনও আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। সীতাকুণ্ডের আমিন জুট মিলস ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদনে যেতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

বন্ধ পাটকলগুলো চালুর পরিকল্পনার সঙ্গে শুধু কারখানা পুনরায় সচল করার বিষয়টি নয়, শ্রমবাজারের একটি বড় অংশকে নতুনভাবে সক্রিয় করার বিষয়টিও জড়িত। পাটকলগুলো চালু হলে সরাসরি শ্রমিক নিয়োগের পাশাপাশি পরিবহন, পাট সরবরাহ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, প্যাকেজিং, বিপণন ও অন্যান্য সহায়ক খাতে পরোক্ষ কর্মসংস্থানও তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে পাটকলগুলো অবস্থিত, সেসব এলাকার স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।

পাটশিল্প বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর একটি। দেশের কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে পাট উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। পাটকলগুলোর উৎপাদন বাড়লে কাঁচা পাটের চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে পাট ও পাটজাত পণ্যের বহুমুখীকরণ করা গেলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি, মানসম্মত উৎপাদন এবং বাজারভিত্তিক পণ্য উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম জানিয়েছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অব্যবহৃত সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যেই বন্ধ মিলগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে মিলগুলো লিজ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পাট ও পাটজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ-সুবিধাসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

তবে বন্ধ পাটকলগুলো চালু করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় অনেক মিলের যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন প্রয়োজন হতে পারে। কোথাও অবকাঠামোর সংস্কার, কোথাও নতুন প্রযুক্তি স্থাপন এবং কোথাও উৎপাদন ব্যবস্থার পুনর্গঠন দরকার হতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কারখানার গেট খুলে উৎপাদন শুরু করলেই দীর্ঘমেয়াদে একটি মিল লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।

বিজেএমসির সাম্প্রতিক তথ্যেও বন্ধ মিলগুলোর পুনঃচালনার পাশাপাশি শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবসরপ্রাপ্তদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি পরিশোধ এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে পাটশিল্পকে টেকসই করতে হলে শুধু প্রচলিত পাটের সুতা বা বস্তা উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং, গৃহস্থালি সামগ্রী, ফ্যাশনপণ্য, জুট কম্পোজিটসহ বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশের পাটশিল্পের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে উৎপাদনের পাশাপাশি গবেষণা, নকশা, গুণগত মান ও বিপণন ব্যবস্থায়ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বন্ধ পাটকল পুনরায় চালুর উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান। একসময় এসব মিলকে ঘিরে বহু পরিবার তাদের জীবিকা পরিচালনা করত। উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর সেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকাংশে স্থবির হয়ে পড়ে। এখন নতুন ব্যবস্থাপনায় মিলগুলো সচল হলে পুরোনো কর্মসংস্থানের কিছু সুযোগ ফিরতে পারে, পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্যও শিল্পখাতে কাজের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বন্ধ মিলগুলো উৎপাদনে ফিরলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এই সংখ্যা বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ, উৎপাদন পরিকল্পনা, শ্রমিক নিয়োগ, বাজার পরিস্থিতি এবং মিলগুলো কত দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারে তার ওপর।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাটকলগুলোর সামনে তাই নতুন এক অধ্যায় শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন শিল্পসম্পদকে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদনমুখী করার এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও পাটভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থ, সম্পদের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত বিষয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প আবারও বড় পরিসরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত