প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, নয়াপল্টনের একটি হাসপাতাল এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব ঘটনার সঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত ও আদালতীয় প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত ভিত্তি হবে।
রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার রাজধানীর সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান কিংবা বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও দখলের মতো ঘটনা নাগরিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। এসব ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাই হোক না কেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
মিরপুর-১ এলাকায় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে ওই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনা ভেঙে ফেলার অভিযোগও ওঠে। জামায়াতের পক্ষ থেকে এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির অংশগ্রহণের অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলার সময় নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করা হয় এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করা হয়েছে। স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথাও জানিয়েছে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং টিকাদানের মতো সেবার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম যুক্ত ছিল। ফলে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু একটি ভবন বা সম্পদের ক্ষতি হয় না, এর প্রভাব পড়ে সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষের ওপরও। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল দাবি করেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে দখলে নেওয়ার ঘটনার সঙ্গে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এ ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তে প্রমাণিত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগ ও প্রমাণিত ঘটনার মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে বিষয়টি দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনাও জামায়াতের বিবৃতিতে উঠে এসেছে। দলটির অভিযোগ, ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে নিউগিনি প্রপার্টিজে অবস্থিত ওই স্টুডিওতে একদল ব্যক্তি রামদা ও কুড়াল নিয়ে হামলা চালায়। হামলাকারীরা স্টুডিওর বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর এবং মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই ঘটনার পেছনে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। অর্থাৎ ঘটনাটির পেছনে রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগও রয়েছে। প্রকৃত কারণ ও হামলায় কারা জড়িত ছিল, তা নির্ধারণে আইনগত তদন্তের গুরুত্ব রয়েছে। হামলার সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
এর পাশাপাশি নয়াপল্টনের ইসলামী ব্যাংক স্পেশালাইজড অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও তুলেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর দাবি, হাসপাতালের গ্লাস ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়েছে এবং রিসেপশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনার সঙ্গেও বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন।
জামায়াতের বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, কথিত স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে একটি দল হাসপাতালটিতে হামলা চালায়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য কিংবা তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরবিরোধী অভিযোগের মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা হলো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও জরুরি সেবার ধারাবাহিকতা। একটি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; সেখানে প্রতিদিন রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বহু মানুষ নির্ভরশীল থাকেন। কোনো হামলা বা ভাঙচুরের কারণে চিকিৎসাসেবা বন্ধ বা সীমিত হলে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে অসুস্থ ও জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থী মানুষের ওপর।
মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব ঘটনার পর বেসরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা এবং দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট কিংবা দখলের ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। দলটির অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ঘটনার সঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীদের কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর এসেছে। তদন্ত এগিয়ে গেলে হামলাকারীদের পরিচয়, ঘটনার উদ্দেশ্য, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
রাজধানীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নাগরিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত যেকোনো সহিংসতার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, কারণ এর সঙ্গে সরাসরি মানুষের জীবন ও চিকিৎসার সুযোগ জড়িত। রাজনৈতিক বিরোধ, জমি-সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা অন্য কোনো কারণেই হামলা হয়ে থাকুক, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার মধ্য দিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এ অবস্থায় জামায়াতের দাবি, সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তের ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।