প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের মডেল মসজিদগুলোকে শুধু নামাজ আদায়ের স্থান হিসেবে নয়, ধর্মীয় শিক্ষা, জনসচেতনতা, সামাজিক কল্যাণ এবং নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচালনার লক্ষ্যে নতুন ব্যবস্থাপনা নীতিমালা জারি করেছে সরকার। ‘মডেল মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৬’ নামে জারি করা এই নীতিমালায় মসজিদের ব্যবস্থাপনা, জনবল নিয়োগ, বেতন ও সম্মানি, ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম, আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং সার্বিক শৃঙ্খলা নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ২৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, এনডিসি এতে স্বাক্ষর করেছেন। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে দেশের মডেল মসজিদগুলোর পরিচালনায় একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় মডেল মসজিদে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের জনবলের দায়িত্ব ও সম্মানির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মডেল মসজিদের পেশ ইমামকে মাসে ২০ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিনকে ১৫ হাজার টাকা এবং খাদিমকে ১২ হাজার টাকা সম্মানি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে খতিব ও নিরাপত্তা প্রহরীর সম্মানি চুক্তিভিত্তিক নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
যেসব মডেল মসজিদের নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, সেসব মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত গ্রেডে জনবলকে বেতন-ভাতা দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে ইমামের জন্য দশম গ্রেড, মুয়াজ্জিনের জন্য ১৬তম গ্রেড এবং খাদিমের জন্য ১৮তম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে। খতিব ও নিরাপত্তা প্রহরীর পদ চুক্তিভিত্তিক রাখার বিধানও রয়েছে।
জনবল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, সততা ও আমানতদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, মডেল মসজিদে কর্মরত খতিবসহ সংশ্লিষ্ট জনবলকে মসজিদের আমানতদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের বিশ্বস্ততা, সততা, পরহেজগারি ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত ছুটি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ না করার বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে।
রাজনৈতিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও নীতিমালায় বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। মডেল মসজিদে কর্মরত জনবল কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারবেন না। এর মাধ্যমে মসজিদের ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমকে নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
জনবলের জন্য উৎসব ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নীতিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে নির্ধারিত জনবলকে উৎসব ভাতা দেওয়া যেতে পারে। ঈদের আগের মাসে যে পরিমাণ সম্মানি দেওয়া হয়, তার সমপরিমাণ অর্থ উৎসব ভাতা হিসেবে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
মডেল মসজিদের কার্যক্রম শুধু নামাজ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন নীতিমালায় সিটি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মসজিদভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য কমিটি রাখার বিধান করা হয়েছে।
মসজিদগুলোতে পবিত্র কুরআন শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, হিফজখানা এবং শিশুদের মক্তব শিক্ষার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বয়স্কদের জন্যও নির্ধারিত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার কাঠামো রাখা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে মসজিদকে একটি শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বও নীতিমালায় বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার নামাজ, প্রাক-খুতবা ও খুতবার আয়োজন, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজ এবং জানাজার নামাজের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব কমিটির ওপর থাকবে। রমজান মাসে তারাবিহ নামাজের জন্য হাফেজ নিয়োগ এবং তাঁদের আবাসনের ব্যবস্থাও করার কথা বলা হয়েছে।
জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রেও মডেল মসজিদগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, শিরক, বিদআত, অপসংস্কৃতি, মাদকাসক্তি, সন্ত্রাস, পরিবেশদূষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, গুজব এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রাক-খুতবা ও খুতবার আয়োজন করতে হবে।
এর ফলে মসজিদের ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সচেতনতা তৈরির একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মাদকাসক্তি, গুজব, নারী নির্যাতন ও সন্ত্রাসের মতো সামাজিক সমস্যার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মসজিদের পরিবেশ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনাকেও নীতিমালায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মসজিদের পবিত্রতা, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা কমিটিকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং বাজেট প্রস্তুতের দায়িত্বও কমিটির ওপর দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা রাখা হয়েছে। মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ, নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা কমিটির ওপর থাকবে। সভার কার্যবিবরণী ও হাজিরা সংরক্ষণ এবং বার্ষিক হিসাব নিরীক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নীতিমালায় মডেল মসজিদের আয়বর্ধক কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে মসজিদের আয় থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। মসজিদের যাবতীয় আয় অনধিক সাত দিনের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মসজিদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় হিসাবযোগ্যতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সরকার ঘোষিত বিভিন্ন বিশেষ দিবসেও মডেল মসজিদগুলোতে নির্ধারিত কার্যক্রম আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব দিবসে দোয়া, মোনাজাত এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে জাতীয় ও সামাজিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষে মডেল মসজিদগুলোকে ধর্মীয় ও জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখার কাঠামো তৈরি হয়েছে।
নতুন নীতিমালার মাধ্যমে মডেল মসজিদগুলোর পরিচালনায় ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জনকল্যাণকে একসঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে এসব মসজিদের পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাজের পরিধি এবং জবাবদিহির কাঠামো আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সক্ষমতা, জনবলের দায়িত্বশীলতা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত তদারকির ওপর। মসজিদগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ, জনবলকে দায়িত্ব অনুযায়ী কাজে যুক্ত রাখা এবং ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা গেলে নীতিমালার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সুযোগ বাড়বে।
সরকারের নতুন এই নীতিমালায় মডেল মসজিদকে ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার একটি সমন্বিত কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে। এখন এর বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন মডেল মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা, জনসচেতনতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।