সংবিধান সংশোধনে আবারও গণভোটের উদ্যোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
সংবিধান সংশোধনে আবারও গণভোটের উদ্যোগ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধানের যেসব মৌলিক বিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের সাংবিধানিক প্রয়োজন রয়েছে, সেসব বিষয়ে নতুন করে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সংসদে সংশোধনী বিল পাসের পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে আগামী বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবাদপত্রের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা জানান কমিটির সভাপতি। পরে সংসদ ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়েও তিনি সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া, গণভোট এবং বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে সংশোধনী বিল সংসদে পাস হওয়ার পর যেসব ধারার ক্ষেত্রে গণভোট প্রয়োজন হবে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সেসব বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হবে। গণভোটে জনগণের অনুমোদন পাওয়া গেলে এরপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে সংশোধন কার্যকর করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

এর ফলে সংবিধান সংশোধনের চলমান উদ্যোগে আবারও জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংশোধনী বিল তৈরি ও অনুমোদনের ধাপ সম্পন্ন হবে। এরপর সাংবিধানিকভাবে গণভোট প্রয়োজন এমন বিষয়গুলো জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নতুন করে যে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে, তা ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে এক নয় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংশোধিত সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক বিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংবিধান যে পৃথক গণভোটের ব্যবস্থা রেখেছে, নতুন উদ্যোগটি সেই সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মতবিনিময় সভায় সংবিধানের কাঠামো, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন মত উঠে আসে। অংশ নেওয়া সম্পাদক ও সাংবাদিকদের অনেকেই মনে করেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নয়, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, আইনজ্ঞ ও বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর মতামতও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে সদস্য নির্বাচনের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। উচ্চকক্ষকে কার্যকর করতে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর বিষয়ে জোর দেওয়া হয়।

মতবিনিময় সভায় কয়েকজন সম্পাদক সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ ছাড়া এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা কঠিন হতে পারে। বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাও বলা হয়।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিরোধী দলকে কমিটিতে যোগ দেওয়ার জন্য একাধিকবার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা যখনই অংশ নিতে চাইবে, তাদের স্বাগত জানানো হবে। বিরোধী দলের প্রস্তাব ও মতামত আলোচনায় এলে সেগুলো বিবেচনা করা সম্ভব হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিভক্তি তৈরি করা নয়, বরং ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়া। জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি নির্বাচনি ইশতেহারে জনগণের কাছে দেওয়া যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

মতবিনিময় সভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তনের সময় নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানে স্পষ্ট ও কার্যকর বিধান রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাবসহ বিভিন্ন মতামত উঠে আসে।

সাংবাদিকদের একাংশ প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আরও স্পষ্ট করার প্রস্তাব দেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, একই ব্যক্তি সরকারপ্রধান ও সংসদ নেতা হওয়ার পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্বে থাকলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এ কারণে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও ভারসাম্য নিশ্চিত করার বিষয়ে মতামত দেওয়া হয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রমের বিকেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী প্রভাব কমানো এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব আসে। পাশাপাশি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবের পরিবর্তে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

সংবিধানের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও প্রস্তাবনা নিয়েও সভায় মতভিন্নতা দেখা যায়। কয়েকজন সম্পাদক ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংক্রান্ত বিধান নিয়ে পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ ধরনের বিষয় অতীতের আলোচনাতেও উঠেছিল, তবে তখন রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়নি। ফলে এসব বিষয় নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনায় বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনায় নেওয়া হবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও মতামত দেওয়া হয়। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সুরক্ষা যুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়। সংবিধান সংশোধনের মতো দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত পরিবর্তনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।

বিশেষ কমিটির কাজের সময়সূচি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার জন্য কাজ চলছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনী বিল প্রস্তুত করা হবে। এরপর সেটি জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় জুলাই জাতীয় সনদকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে রাখা হলেও নির্বাচনি ইশতেহারের অঙ্গীকার এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতও বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। কমিটির আলোচনায় যেসব প্রস্তাব এসেছে, তার সবগুলো সংবিধানে যুক্ত হবে না; কোন বিষয় সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য আর কোনটি সাধারণ আইন বা নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে করা সম্ভব, সেটিও যাচাই করা হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংবিধান সংশোধন বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি বিষয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ—এসব প্রশ্নের সঙ্গে সংবিধান সরাসরি যুক্ত। ফলে এবার যে সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা শুধু সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত, রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর স্থায়িত্বের প্রশ্নও জড়িত।

বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে আলোচনায় ফেরার আহ্বান এবং ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্যের কারণে আগামী কয়েক মাস সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংসদে বিল উত্থাপন, সংশোধনী নিয়ে বিতর্ক এবং সাংবিধানিকভাবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গণভোট—এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই শেষ পর্যন্ত কোন কোন পরিবর্তন সংবিধানে যুক্ত হবে, তা নির্ধারিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত