প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জাপানে ইসলামিক সেন্টার অব জাপানের চেয়ারম্যান ড. আইমান ওমরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। রোববার জাপানের সাইতামায় বায়তুল আমান মসজিদ কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত এ সাক্ষাতে জাপানে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা এবং কমিউনিটি কল্যাণে পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সাক্ষাতে ইসলামিক মিশন জাপানের সভাপতি হাফেজ সাবের আহমদ এবং সংগঠনটির নেতা ও ইসলামিক সেন্টার অব জাপানের পরিচালক হাফেজ আলাউদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জাপানে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রয়োজন, ধর্মীয় পরিচয় ও মূল্যবোধ বজায় রেখে স্থানীয় সমাজে সম্পৃক্ত থাকা এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
সাক্ষাতের শুরুতে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জাপানে সামাজিক ও কমিউনিটি কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার জন্য হাফেজ সাবের আহমদ ও ড. আইমান ওমরকে অভিনন্দন জানান। তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের কল্যাণে তাঁদের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে সমাজসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় ইসলামী সংগঠনগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
তিনি পবিত্র কোরআনের একটি নির্দেশনার উল্লেখ করে সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে ইসলামী সংগঠনগুলোর মধ্যে সহযোগিতা শুধু ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের কল্যাণ, মানবিক সহায়তা এবং কমিউনিটির বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা সমাধানেও বিস্তৃত করার কথা উঠে আসে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, জাপানে বসবাসরত মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজন ও সমস্যা থাকতে পারে। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ইসলামী সংগঠনগুলোর সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাপানের আইন, সামাজিক নিয়মকানুন ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রেখে মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন পরিচালনায় সহযোগিতা করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
সৌজন্য সাক্ষাতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় আহত ব্যক্তিদের বিষয়েও আলোচনা হয়। অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বিশেষ করে গুরুতর আহত এবং অঙ্গহানির শিকার শিক্ষার্থীদের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব মানুষের অনেকেরই কৃত্রিম অঙ্গসহ বিভিন্ন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি এ ধরনের আহত মানুষের পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে মানবিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জাপানে কার্যরত ইসলামী সংগঠনগুলো মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরও ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মত দেন।
আলোচনার এই পর্যায়ে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে মতবিনিময় হয়। ড. আইমান ওমর জানান, তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রোবোটিক্স ও কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রযুক্তি রয়েছে। গুরুতর আহত হয়ে অঙ্গহানির শিকার ব্যক্তিদের সহায়তায় এসব প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে করা যায়, সে বিষয়েও তিনি কাজ করছেন বলে জানান।
তিনি প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের কল্যাণে তাঁর গবেষণা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ফলে বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও মানবিক সহায়তার সম্ভাব্য সমন্বয়।
জাপানে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের বর্তমান পরিস্থিতিও বৈঠকে আলোচনায় আসে। সাক্ষাতে জাপানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ বলে উল্লেখ করা হয়। দেশটিতে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হালাল খাদ্য, ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা প্রয়োজনও বাড়ছে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
ইসলামিক মিশন জাপান এবং ইসলামিক সেন্টার অব জাপান মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও কমিউনিটি কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে বলে জানানো হয়। এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে জাপানের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মুসলিমদের সচেতন করা এবং স্থানীয় আইন ও সামাজিক নিয়মকানুন অনুসরণে সহযোগিতা করা।
জাপানে বসবাসরত মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয় ও মূল্যবোধ বজায় রাখার পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। স্থানীয় সমাজের প্রতি সম্মান, পারস্পরিক সহাবস্থান এবং দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণকে কমিউনিটি কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার কথা আলোচনায় উঠে আসে।
এ ছাড়া জাপানে মুসলিমদের হালাল ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবেশ তৈরিতে বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশে মুসলিমদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ বজায় রাখার বিষয়টি আলোচনার অংশ ছিল।
মসজিদে জামায়াতে নামাজসহ অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি এবং তা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় করেন অংশগ্রহণকারীরা। পাশাপাশি মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক সহায়তা এবং কমিউনিটি সংযোগ জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
বৈঠকে মানবিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। জাপানে বসবাসরত মুসলিমদের পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। ধর্মীয় সংগঠনগুলো তাদের নিজস্ব পরিচয়ের পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক কল্যাণে কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জাপানের ইসলামিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের এ সাক্ষাৎ মূলত সৌজন্য ও মতবিনিময়কেন্দ্রিক হলেও এতে ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা, প্রযুক্তি, কমিউনিটি উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রযুক্তি নিয়ে ড. আইমান ওমরের গবেষণার প্রসঙ্গ আহত মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনায় নতুন একটি মাত্রা যোগ করে।
সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে জাপানে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায় এবং বৃহত্তর জাপানি সমাজের কল্যাণে পারস্পরিক সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা ও গঠনমূলক সামাজিক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় আইন ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতি সম্মান রেখে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
জাপানে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তৃতির সঙ্গে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনও পরিবর্তিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম শুধু উপাসনাকেন্দ্রিক না থেকে শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পুনর্বাসন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। মুজিবুর রহমান ও ড. আইমান ওমরের সাক্ষাতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা সেই বৃহত্তর সহযোগিতার সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে।