প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও মব সহিংসতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। তিনি দাবি করেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে দায়িত্বে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না।
সোমবার রাজধানীতে এনসিপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে মব থাকবে না এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আগে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা প্রতিফলিত হচ্ছে না।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য মূলত দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং সরকারের দায়িত্বশীলতা নিয়ে তাঁর দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন। তবে তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবে এসেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান ভিন্ন।
এর আগের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। তিনি অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে অপরাধের ধরন বিবেচনায় নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও কথা বলেন। তাঁর দাবি, প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থী নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন। তিনি বলেন, এসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা না থাকলে তাঁদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে তাঁর বক্তব্যে চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতার প্রশ্নও উঠে আসে। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের তথ্য না থাকলে শুধু কোনো নির্দিষ্ট কারণে তাঁদের নিয়োগ আটকে রাখা উচিত নয়। তবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রক্রিয়ার সরকারি নথি ও যাচাইয়ের ফলাফলের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি দাবি করেন, ওই ভাষণে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি এবং সেখানে সরকারের দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘের ভাষণের সরকারি বিবরণে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। ওই ভাষণে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, রোহিঙ্গা সংকট এবং বিশ্বশান্তিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ইস্যু তুলে ধরার কথা জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে তাঁদের নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনকে সমাধানের মূল পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
নাহিদ ইসলাম অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। তাঁর মতে, দেশের অভ্যন্তরে মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে এমন বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপি আহ্বায়ক। তিনি সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং পুশইনের অভিযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়নি। সীমান্ত নিরাপত্তা ও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও নাহিদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, সংকটের সমাধানের বাস্তব পদ্ধতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়নি। তবে জাতিসংঘে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি প্রশ্ন করেন, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা নদীর মহাপরিকল্পনা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নদী ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, নদীভাঙন এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে তিস্তা নদীর বিষয়টি সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এ ইস্যুকে জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখার কথা বলেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নাহিদ ইসলামের মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন সরকারও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। রাজধানীর একটি ভাঙচুরের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার বিষয়েও তিনি বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ফলে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যেখানে সরকারের সক্ষমতা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে অপরাধ দমনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে মূল পার্থক্যটি হলো পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং তা মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে।
নাহিদ ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে একই আলোচনার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে সরকারের কাছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে বাংলাদেশের স্বার্থকে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপনের দাবি উঠে আসে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। ফলে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব ও সরকারের নিরাপত্তানীতি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও এখন আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। কয়েক হাজার চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে কোনো প্রার্থীর নিয়োগ স্থগিত বা বাতিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট যাচাইয়ের কারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আপিল বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকলে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
একইভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল বিষয়। মব সহিংসতা, অপরাধ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আইন প্রয়োগে দুর্বলতার অভিযোগ—যে কোনো বিষয়েই নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে; বিরোধী দলের বক্তব্যে আবার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে সরকার বলছে, রোহিঙ্গা সংকট, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে নাহিদ ইসলাম মনে করছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংকট ও দ্বিপক্ষীয় ইস্যু আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল।
সব মিলিয়ে নাহিদ ইসলামের সংবাদ সম্মেলনে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের বিপরীতে সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থানও রয়েছে। এখন এসব বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, তদন্তের ফল এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে বিতর্কিত বিষয়গুলো কীভাবে এগোয়।