শিল্পায়নে পিছিয়ে দেশের পুঁজিবাজার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
শিল্পায়নে পিছিয়ে দেশের পুঁজিবাজার

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন বাড়ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম সম্ভাব্য উৎস পুঁজিবাজার সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের বড় অংশ এখনো ব্যাংকনির্ভর। অন্যদিকে পুঁজিবাজার থেকে শিল্প খাতে সরাসরি অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ এতটাই কম যে সামগ্রিক অর্থায়ন কাঠামোয় এর ভূমিকা খুব সীমিত হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য থাকায় উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে পুঁজিবাজারের পরিবর্তে ব্যাংকের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এতে একদিকে ব্যাংক খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে পুঁজিবাজারে ভালো ও মৌলিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানির সরবরাহ বাড়ছে না। ফলে শিল্পায়নের সঙ্গে পুঁজিবাজারের যে পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা, সেটি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৯৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা অর্থায়ন হয়েছে। একই সময়ে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় পুঁজিবাজারের মাধ্যমে শিল্পায়নে অর্থায়নের অংশ ছিল অত্যন্ত সামান্য।

এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ ব্যাংকিং মাধ্যমে শিল্প খাতে অর্থায়ন হয়েছিল প্রায় ৮৮ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে এসেছিল ৬৭৯ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে শিল্পায়নে অর্থায়ন ছিল প্রায় ৯৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, আর পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল ৬৪১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরেও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৭২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা অর্থায়নের বিপরীতে পুঁজিবাজার থেকে এসেছিল ৬৮৫ কোটি টাকা।

এই পরিসংখ্যান থেকে শিল্প খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে দুই খাতের মধ্যে বড় ব্যবধান স্পষ্ট হয়। একই সঙ্গে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে শিল্প খাতে অর্থ সংগ্রহের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার বদলে বরং কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় আরও কমে যায়।

পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই অর্থবছরে কোনো কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে নতুন করে তালিকাভুক্ত হয়নি। ওই বছরে ইক্যুইটি ইস্যুর মোট পরিমাণও আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও ব্যবসায়িক অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করছেন, পুঁজিবাজারে আসতে দীর্ঘ সময় লাগা এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। একটি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে উদ্যোক্তার কাছে ব্যাংক ঋণ তুলনামূলকভাবে সহজ ও দ্রুত বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে ব্যবসার সম্প্রসারণ বা নতুন প্রকল্পের জন্য দ্রুত অর্থের প্রয়োজন হলে দীর্ঘ আইপিও প্রক্রিয়া অনেক উদ্যোক্তার কাছে আকর্ষণ হারায়।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি আইপিও অনুমোদন পাওয়ার পর বাজারে আসতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত হওয়ায় উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকমুখী হচ্ছেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সংস্কার উদ্যোগের প্রতি আশাবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।

পুঁজিবাজারের অর্থায়ন বাড়াতে নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের মতে, নির্দিষ্ট সীমার বেশি অর্থের প্রয়োজন হলে শুধু ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর না করে পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহের সুযোগ ও বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যেতে পারে। বড় শিল্প প্রকল্প বা ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অর্থায়নের মধ্যে একটি যৌক্তিক অনুপাত নির্ধারণের প্রস্তাবও এসেছে।

তাদের যুক্তি হলো, দীর্ঘমেয়াদি বড় প্রকল্পের পুরো অর্থায়নের দায়িত্ব ব্যাংক খাতের ওপর পড়লে ব্যাংকের সম্পদ ও তারল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো প্রকল্পের অর্থ পরিশোধে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হলে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের মেয়াদের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে শেয়ার বা দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্র ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করা গেলে অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় হতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে শিল্প ও অবকাঠামো খাতে পুঁজিবাজারের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি। শেয়ারবাজারের পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, সুকুক, গ্রিন বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে বড় প্রকল্পে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশেও এসব বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের পুঁজিবাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগযোগ্য ভালো কোম্পানির স্বল্পতা। একটি কার্যকর পুঁজিবাজারের জন্য নিয়মিত নতুন ও মৌলিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে বিনিয়োগকারীদের হাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয় এবং বাজারের গভীরতা বাড়ে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির গতি কম থাকায় বিনিয়োগকারীদের সামনে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগও সীমিত হয়েছে।

এ ছাড়া দেশের পুঁজিবাজার এখনো মূলত ইক্যুইটিনির্ভর। উন্নত বন্ড মার্কেট, কার্যকর মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পণ্য পর্যাপ্ত শক্তিশালী না হওয়ায় কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যাংক ঋণের বাইরে বড় পরিসরে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ সীমিত থাকে। ফলে অর্থায়নের বৈচিত্র্য তৈরি না হয়ে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ে।

ভালো কোম্পানি বাজারে না আসার সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়টিও জড়িত। অতীতে তালিকাভুক্ত কিছু কোম্পানির দুর্বল আর্থিক অবস্থান, ব্যবসায়িক কর্মদক্ষতার অবনতি এবং শেয়ারের শ্রেণি পরিবর্তনের ঘটনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে সতর্ক করেছে। ফলে শুধু নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; বাজারে আসা কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা, করপোরেট সুশাসন ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকেও পুঁজিবাজারে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাবলিক অফার-সংক্রান্ত বিধিমালায় পরিবর্তনের পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ নিয়েও কাজ চলছে। ২০২৬ সালে সরাসরি তালিকাভুক্তি নিয়ে নতুন বিধিমালার খসড়া প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী কোম্পানির জন্য পুঁজিবাজারে প্রবেশের বিকল্প পথ তৈরি করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

একই সঙ্গে করপোরেট বন্ড ও অন্যান্য ঋণপত্রের বাজার সম্প্রসারণেও নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে উদ্যোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পাওয়া এবং ঋণপত্রের বাজারকে আরও কার্যকর করার প্রচেষ্টা দেখাচ্ছে যে পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ারনির্ভর না রেখে বহুমাত্রিক অর্থায়ন কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।

পুঁজিবাজারের মাধ্যমে শিল্পায়নের অর্থায়ন বাড়াতে হলে শুধু আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুত করাই যথেষ্ট হবে না। কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসার জন্য বাস্তব প্রণোদনা দিতে হবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়াতে হবে এবং বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বন্ড, সুকুক ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিকল্প আর্থিক পণ্যগুলোর বাজারও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্প, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের জন্য বিপুল দীর্ঘমেয়াদি অর্থের প্রয়োজন হবে। এই প্রয়োজনের পুরোটা যদি ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে আর্থিক ব্যবস্থায় ঝুঁকি কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। বিপরীতে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থায়ন কাঠামো গড়ে উঠলে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থের উৎস বাড়বে এবং আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপও ভাগ হয়ে যেতে পারে।

তাই শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা বাড়ানোর প্রশ্নটি শুধু শেয়ারবাজারের উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। নীতিমালা সংস্কার, দ্রুত তালিকাভুক্তি, ভালো কোম্পানির সরবরাহ, বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা—এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তন কতটা বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের শিল্পায়নে পুঁজিবাজার ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত