প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। এর ফলে তেল সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কা নতুন করে বাজারে ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে।
সোমবার সকালে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের আগাম দাম ১ দশমিক ৩২ ডলার বা ১ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ দশমিক ৬৪ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৭০ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ১১ ডলারে ওঠে। গত সপ্তাহের শেষ দিক থেকেই তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল। নতুন সপ্তাহের শুরুতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকায় জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে আনা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিরসন এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের দেওয়া একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা কমার পরিবর্তে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরান সংঘাত নিরসনের একটি প্রস্তাব দেয়। কাতারের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছিল বলে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়। শনিবার ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করার কথা জানান। তবে পরদিন এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। ফলে একদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা থাকলেও অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় তেলবাজারে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
এএনজেডের বিশ্লেষকেরা সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এখনো যথেষ্ট বেশি। ইরান ও ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংঘাত এবং সৌদি আরবকে ঘিরে হামলার ঘটনাগুলো এ অঞ্চলের জ্বালানি প্রবাহের ওপর ঝুঁকি তৈরি করছে। শনিবার ভোরে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনি জোট জানায়, ইরান-সমর্থিত হুতিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের দিকে যাওয়ার সময় প্রতিহত করা হয়েছে। একই সময়ে আরও দুটি ড্রোন প্রতিহত করার কথাও জানানো হয়।
তবে সামগ্রিক বাজারচিত্র শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ওপর নির্ভর করছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতিও অপরিশোধিত তেলের দামের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছিল। বিপরীতে ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমেছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পর দেশটি ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে—এমন আশঙ্কা বাজারে তৈরি হয়েছিল। এই সম্ভাবনা ডব্লিউটিআইয়ের দামে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি সীমিত করলে দেশটির পরিশোধনাগারগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এএনজেডের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে চাপ এখনো বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ডিজেল রপ্তানিতে সম্ভাব্য বিধিনিষেধের বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক তথ্যও এসেছে। জ্বালানিপণ্যবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বেড়েছে। এ সময়ে রপ্তানি দৈনিক প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে, যা ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি বৃদ্ধিকে এ সরবরাহ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনও বেড়েছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৭৪ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বের জ্বালানি বাজারে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে অঞ্চলটিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তেল পরিবহন স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে বাজারে দ্রুত উদ্বেগ তৈরি হয়। পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই অনেক সময় প্রকৃত সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আগেই তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
সৌদি আরবের তেল পরিবহন ব্যবস্থাতেও সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব পড়েছে। দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হুতিদের হামলার পর সৌদি আরব তার তেল রপ্তানির একটি অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে পূর্বাঞ্চলের রাস তানুরা বন্দরে সরিয়ে নেয়। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল পরিবহনের পরিমাণ বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি তেলের আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় ও আমদানি ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপথ, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নীতি এবং প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি—সবকিছুই এখন বিশ্ববাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে সরবরাহ বাড়ানোর কিছু লক্ষণ থাকলেও অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে চাপ তেলের দামকে অস্থির করে রাখছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনপথগুলো কতটা স্বাভাবিক থাকে, তার ওপর বাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে। সংঘাত কমলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। বিপরীতে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম আরও অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকবে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে এখন নজর রয়েছে যুদ্ধ, কূটনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ—তিনটি দিকের ওপরই।