প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর শেরেবাংলানগর ও মিরপুর এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে করা পৃথক দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও বরখাস্ত মেজর মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার তদন্ত কর্মকর্তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন।
আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালতের এই আদেশের ফলে মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরী এখন আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ওই দুটি মামলাতেও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার হিসেবে গণ্য হবেন। এর আগে তিনি অন্য একটি হত্যা মামলায় কারাগারে ছিলেন।
মামলার নথি ও তদন্ত কর্মকর্তাদের আবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় করা একাধিক মামলায় মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শেরেবাংলানগর ও মিরপুরের পৃথক দুটি ঘটনায় তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতকে জানান, প্রাথমিক তদন্তে দুটি ঘটনাতেই মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীর সম্পৃক্ততা এবং ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। মামলাগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল রাজধানীর মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট হত্যা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে একাধিক দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি মিরপুর মডেল থানায় দায়ের করা অন্য একটি হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
শেরেবাংলানগরের মামলাটি করা হয়েছে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৮ জুলাই শেরেবাংলানগর থানাধীন ধানমণ্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুলের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও পুলিশি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিদের নির্দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল, পিস্তল, চায়নিজ কুড়াল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় একজন আন্দোলনকারী দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীর থেকে একাধিক বুলেট বের করা হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সময় আন্দোলনরত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার কথাও অভিযোগে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ এবং আহত হওয়ার এসব ঘটনা পরবর্তী সময়ে একাধিক আইনি প্রক্রিয়ার জন্ম দেয়। ওই সময়ের বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত এখনো বিভিন্ন মামলায় চলমান রয়েছে।
মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীকে যে দ্বিতীয় মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেটি মিরপুর এলাকার একটি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৫ আগস্ট বিকেলে মিরপুর মডেল থানার কাছের প্রধান সড়কে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার একটি মিছিলের ওপর হামলা চালানো হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই সময় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, ছররা গুলি ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এ ঘটনায় মইনুল ইসলাম তূর্য নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। পরে তাকে রড ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগও রয়েছে।
আহত মইনুল ইসলাম তূর্যকে পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়া হয়। মামলার তথ্য অনুযায়ী, তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াও এসব মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
দুটি মামলায় মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতের কাছে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের আবেদনে বলা হয়, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তিনি অন্য মামলায় কারাগারে থাকায় সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আদালতের অনুমতি চাওয়া হয়।
আদালত তদন্ত কর্মকর্তাদের আবেদন বিবেচনা করে তাকে দুটি মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। এর ফলে এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
তবে কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বা আসামি হিসেবে নাম থাকা মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচাই হওয়ার বিষয়। মামলার অভিযোগ, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় গত কয়েক বছরে বহু মামলা হয়েছে। এসব মামলায় রাজনৈতিক নেতা, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অনেক মামলায় তদন্ত চলমান রয়েছে এবং আদালতে পর্যায়ক্রমে আসামিদের গ্রেপ্তার দেখানো, রিমান্ড, জামিন ও অন্যান্য আইনি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীর ক্ষেত্রেও একাধিক মামলায় একই সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। একটি মামলায় কারাগারে থাকা অবস্থায় নতুন দুটি মামলায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হলো। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট দুটি ঘটনার সঙ্গে তার ভূমিকা ও উপস্থিতির বিষয়ে পাওয়া তথ্য যাচাই করতেই এই আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছে।
এখন এসব মামলার তদন্তের পরবর্তী ধাপ কী হয়, নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে কি না এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আদালতে কী ধরনের কার্যক্রম হয়—সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে মামলার অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য বিচারিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিও পরবর্তী প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট হবে।
আন্দোলনের সময় সহিংসতায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এসব মামলার বিচারিক অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা বিচারপ্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ। ফলে তদন্তের স্বচ্ছতা, প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন এবং আদালতের মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তিই শেষ পর্যন্ত এসব ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করবে।
মাঞ্জিল হায়দার চৌধুরীকে শেরেবাংলানগর ও মিরপুরের পৃথক দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর মধ্য দিয়ে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন ধাপ যুক্ত হলো। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকায় নতুন করে তাকে হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন না হলেও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে তার বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম চলবে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।