চীনকেই অস্ত্র কেনার প্রস্তাব ট্রাম্পের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৮ বার
চীনকেই অস্ত্র কেনার প্রস্তাব ট্রাম্পের

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি নিয়ে চীনের দীর্ঘদিনের আপত্তির মধ্যেই বেইজিংকে পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এমন তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে আলোচনার সময় ট্রাম্প সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন, বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো অস্ত্র কিনতে আগ্রহী কি না।

তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা রয়েছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং দ্বীপটির স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে। এই অস্ত্র বিক্রিকে চীন তার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে দেখে।

এমন একটি স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে চীনের কাছেই মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবের কথা সামনে আসায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সামরিক প্রতিযোগিতা এবং তাইওয়ান ইস্যুতে একাধিক মতবিরোধ চলমান থাকায় ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে কূটনৈতিক আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিষয় তুলে ধরে আসছেন—যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। সেই ধারাবাহিকতায় চীনের কাছেও অস্ত্র বিক্রির সম্ভাবনার কথা তিনি তুলেছিলেন। এমনকি একপর্যায়ে ট্রাম্প সরাসরি সি চিন পিংকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো অস্ত্র কিনতে চান কি না।

পারডিউয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের নেতারা যখনই মুখোমুখি আলোচনায় বসেন, তখন অন্যান্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়ও আলোচনায় আসে। তিনি আরও জানিয়েছেন, অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে চীন আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো অস্ত্র কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি অবশ্য বহুদিন ধরেই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়। বেইজিংয়ের অবস্থান হলো, তাইওয়ান চীনের অংশ এবং দ্বীপটির সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করা চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখাকে নিজেদের দীর্ঘদিনের নীতির অংশ হিসেবে দেখে।

এই বিরোধের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আইনগত বাধ্যবাধকতাও। তাইওয়ানের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের একটি দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত ও আইনি কাঠামো রয়েছে। ফলে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব আইন ও পররাষ্ট্রনীতিও জড়িত।

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে তাইওয়ানের কাছে প্রায় ১ হাজার ১১০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পারডিউয়ের দাবি অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমলে তাইওয়ানের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন। এই সিদ্ধান্তের পরও চীনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আপত্তি ও সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে।

চীন বরাবরই বলে আসছে, তাইওয়ানের স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবে না। গত জুনেও বেইজিং তাইওয়ানকে সতর্ক করে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে কিংবা সামরিক উপায়ে স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা সফল হবে না। চীনের এই অবস্থান তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনার সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগও বাড়িয়ে রেখেছে।

সি চিন পিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময়ও তাইওয়ান ইস্যুটি আলোচনায় আসে। সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এ বিষয়ে ‘বিচক্ষণতা’ দেখানোর আহ্বান জানান বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে তিনি তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বানও জানান। এর মধ্য দিয়ে বেইজিং যে তাইওয়ান প্রশ্নকে তার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে দেখছে, সেটি আবারও স্পষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানে তাইওয়ান ইস্যুটি শুধু সামরিক সহযোগিতা বা অস্ত্র বিক্রির বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে বৃহত্তর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দর-কষাকষির বিষয়ও যুক্ত হচ্ছে। এর আগে গত মে মাসে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তাইওয়ানের জন্য প্রস্তুত করা একটি অস্ত্রসহায়তা প্যাকেজ চীনের সঙ্গে আলোচনায় দর-কষাকষির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

এই মন্তব্যের পর তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে ওয়াশিংটনের অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত যদি বৃহত্তর কূটনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তাইওয়ানের নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও কৌশলগত হিসাবেও তার প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।

তবে ট্রাম্পের চীনকে অস্ত্র কেনার প্রস্তাবকে সরাসরি কোনো নতুন অস্ত্র চুক্তির ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রদূত পারডিউয়ের বক্তব্যে মূলত আলোচনার সময় ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এমন একটি প্রশ্ন বা প্রস্তাব তোলার বিষয়টি এসেছে। চীনের পক্ষ থেকে এর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কেনার কোনো সিদ্ধান্তের কথা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক বর্তমানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জটিল। বাণিজ্য ও প্রযুক্তি থেকে শুরু করে সামরিক প্রতিযোগিতা এবং তাইওয়ান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের স্বার্থের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্র বিক্রির মতো স্পর্শকাতর বিষয় আলোচনায় আসা দুই দেশের সম্পর্কের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রিকে তিনি অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়, কারণ একই সময়ে ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে এবং বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করছে। ফলে চীনের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবটি বাস্তব বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পাশাপাশি কূটনৈতিক বার্তাও বহন করছে কি না, সেটি ভবিষ্যতের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থানের এই টানাপোড়েনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা। বেইজিং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে প্রতিহত করার কথা বলে আসছে। ওয়াশিংটন আবার তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে চলেছে। ফলে দুই পরাশক্তির কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিটি পদক্ষেপ তাইওয়ান প্রণালি এবং বৃহত্তর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বাস্তবতায় চীনের প্রেসিডেন্টের কাছে ট্রাম্পের অস্ত্র কেনার প্রশ্ন নিছক বাণিজ্যিক প্রস্তাব, নাকি বৃহত্তর কূটনৈতিক কৌশলের অংশ—তা স্পষ্ট হওয়ার জন্য আরও আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের প্রয়োজন রয়েছে। আপাতত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যই এ বিষয়ে সামনে আসা প্রধান তথ্য। তবে ঘটনাটি এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে, যখন তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পারস্পরিক অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথে তাইওয়ান ইস্যু কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। নতুন করে অস্ত্র বিক্রির প্রসঙ্গ সামনে আসায় সেই আলোচনাই আরও জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট যে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় সামরিক বাণিজ্য এখন কেবল প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয় নয়; বরং বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও তা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত