প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শীত আসার আগেই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের প্রস্তুতি শুরু করেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। শীতকালে বায়ুর মান দ্রুত অবনতি হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে আগামী ১ নভেম্বর থেকে সরকারি ও বেসরকারি অফিসে ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করার ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে দিল্লি সরকার। একই সঙ্গে দূষণকারী যানবাহনের প্রবেশে বিধিনিষেধ, পার্কিং ফি বাড়ানো, নির্মাণ ও ভাঙার কাজে নিষেধাজ্ঞা এবং অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তনের মতো একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দিল্লির শীতকালীন বায়ুদূষণ মোকাবিলার বিভিন্ন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, পরিবেশমন্ত্রী মণিন্দর সিং সিরসা এবং বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় যানবাহন, নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দূষণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত এবং বিএস-সিক্স নির্গমন মানদণ্ড পূরণ করে না—এমন যানবাহনের রাজধানীতে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। তবে সিএনজি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং জরুরি পরিষেবার আওতাভুক্ত কিছু যানবাহন এ বিধিনিষেধের বাইরে থাকবে। এই ব্যবস্থা ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা রয়েছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণে গাড়ির বৈধ সনদ নিশ্চিত করতেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ‘পলিউশন আন্ডার কন্ট্রোল সার্টিফিকেট’ বা পিইউসিসি ছাড়া গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ না করার নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দিল্লির জ্বালানি স্টেশনগুলোতে স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাড়ির তথ্য যাচাই করা হবে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গত এক বছরে কয়েক হাজার পুরোনো ও দূষণকারী যানবাহন শনাক্ত করা হয়েছে।
শীতের কয়েক মাসে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যেও পার্কিং ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত অনুমোদিত পার্কিং এলাকায় বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ ফি নেওয়া হবে। তবে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশনের নিজস্ব মালিকানাধীন ও পরিচালিত পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে এই বাড়তি ফি প্রযোজ্য হবে না। কর্তৃপক্ষের ধারণা, পার্কিং ব্যয় বাড়লে অনেক মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন বা বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থার দিকে যেতে উৎসাহিত হতে পারেন।
অফিসে কর্মীদের যাতায়াতের চাপ কমাতে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থাকে শীতকালীন পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৫০ শতাংশ কর্মী অফিসে উপস্থিত থেকে কাজ করবেন এবং বাকি ৫০ শতাংশ বাসা থেকে কাজ করবেন। শীতকালীন দূষণের সময়ে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমানো এবং অফিসগামী মানুষের যাতায়াতের চাপ কমানোই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
অফিসের সময়সূচিও আলাদা করা হচ্ছে। দিল্লির মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের অফিস সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং দিল্লি সরকারের অধীন অফিস সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত পরিচালিত হবে। ভিন্ন সময়ে অফিস শুরু ও শেষ করার মাধ্যমে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক কর্মীর সড়কে নামার চাপ কমানোর চেষ্টা করা হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও গণপরিবহন, কারপুলিং ও রাইড শেয়ারিংয়ের মতো ব্যবস্থা উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে।
নির্মাণ ও ভাঙার কাজের ওপরও বড় ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ধুলা তৈরি করে এমন ভাঙার কাজ এবং খোলা জায়গায় সাধারণ নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে। এর পর আরও কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে ১০ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সব ধরনের নির্মাণ ও ভাঙার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জরুরি জনপরিকাঠামোর কিছু কাজ এ বিধিনিষেধের বাইরে থাকতে পারে।
দিল্লির বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস হিসেবে নির্মাণকাজ থেকে তৈরি ধুলাকে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বড় নির্মাণস্থলগুলো নজরদারিতে রাখতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এআই-সমর্থিত ক্যামেরা, ধুলা পর্যবেক্ষণ এবং ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে নিয়ম ভঙ্গকারী নির্মাণস্থল শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে শীতকালে শুধু কাগজে নিষেধাজ্ঞা জারি না রেখে মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
রাস্তার ধুলা কমাতেও দিল্লি কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। ২০২৬ সালে প্রায় ৩ হাজার ৬৫ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের আগে এর একটি বড় অংশের কাজ শেষ হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাজ তখনও বাকি ছিল। কর্তৃপক্ষ অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রাস্তার কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করেছে, যাতে শীতের দূষণ মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ধুলার উৎসগুলো কমানো যায়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে। দিল্লিতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য তৈরি হলেও তার সবটুকু প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয় না। কর্তৃপক্ষ নতুন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি যান্ত্রিকভাবে রাস্তা পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত গাড়ির সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। রাস্তার ধুলা ও আবর্জনা কমানো গেলে বাতাসে ভাসমান কণার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণেও নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। এ জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের জন্য মনিটরিং স্টেশনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং শত শত প্রয়োগকারী দল মাঠে কাজ করছে। গত এক বছরে বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানা পরিদর্শন করে দূষণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
দিল্লির বায়ুদূষণ শুধু শহরটির নিজস্ব কর্মকাণ্ডের ফল নয়—এটি বৃহত্তর দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল সমস্যা। শীতকালে বাতাসের গতি কমে যাওয়া, তাপমাত্রার পরিবর্তন, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা, বর্জ্য পোড়ানো এবং কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর মতো বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে দূষণের মাত্রা বাড়াতে পারে। এ কারণে এবার দিল্লির বাইরে এনসিআরের অন্যান্য শহরগুলোর সঙ্গেও সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনায় ঝুঁকিপূর্ণ দূষণস্থলগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বায়ুমান সূচক বা একিউআইয়ের পরিস্থিতি জানানো এবং নতুন একটি নাগরিক পরামর্শ ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মতামত নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লির দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু শীতের কয়েক মাসের জরুরি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। পরিবহন, শিল্প, নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিজ উৎস—সবগুলো ক্ষেত্রেই সারা বছর ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। সেই দিক থেকে এবার শীতকালীন ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রয়োগের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
দিল্লির মানুষের জন্য নতুন এসব বিধিনিষেধের প্রভাব দৈনন্দিন জীবনেও পড়বে। অনেক কর্মীকে ঘরে বসে কাজ করতে হবে, অফিসের সময় বদলাবে, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে চলাচলের খরচ বাড়তে পারে এবং নির্মাণ খাতে কাজের ওপর সাময়িক সীমাবদ্ধতা আসবে। একই সঙ্গে শহরের বাতাসের মান উন্নত হলে তার সুফল সবচেয়ে বেশি পাবেন নগরবাসী—বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং দূষণের কারণে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা।
কর্তৃপক্ষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়। শীতের দূষণ প্রতিবছরই দিল্লির জন্য বড় জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উদ্বেগ তৈরি করে। এবার শীত আসার আগেই আগাম প্রস্তুতি, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা, অফিসে ৫০ শতাংশ কর্মীর বাড়ি থেকে কাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে সেই চাপ কমানোর চেষ্টা করছে দিল্লি। তবে পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মগুলোর ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং দিল্লি-এনসিআরজুড়ে সমন্বিত উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।