আড়িয়াল খাঁ নদের ৫ কিমিতে ২০ জালের বাঁধ, বিপন্ন মাছ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৭ বার
আড়িয়াল খাঁ নদের ৫ কিমিতে ২০ জালের বাঁধ, বিপন্ন মাছ

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী ও নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার সীমানাঘেঁষে বয়ে চলা আড়িয়াল খাঁ নদের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত ২০টি অবৈধ জালের বাঁধ স্থাপন করা হয়েছে। নদটির এক পাড় থেকে অন্য পাড় পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে এসব জাল বসানোয় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব জালে পোনামাছ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী আটকা পড়ছে। একই সঙ্গে নদে মালবাহী নৌযান চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাছ শিকার চলতে থাকলে নদটির মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় জেলেদের জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে আড়িয়াল খাঁ নদের বিভিন্ন অংশে জালের বাঁধের বিস্তার বাড়ছে। নদটি দুই উপজেলার বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং নৌপথে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু নদজুড়ে একের পর এক জালের কাঠামো তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ও মাছের বিচরণপথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও নদটির প্রায় পুরো প্রস্থজুড়ে জাল টানানো হয়েছে। ফলে মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদে বাঁশ, কাঠ ও বাঁশের ভানা ব্যবহার করে উঁচু কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এসব কাঠামোর সঙ্গে খরা, ড্রিম ও কারেন্ট জাল বসিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাল ফেলার অংশটুকু বাদ দিলে কোনো কোনো স্থানে মাছের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত খোলা পথ থাকছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। নদটির এক পাড় থেকে অন্য পাড় পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে জাল টানানোর কারণে মাছের স্বাভাবিক গতিপথে বাধা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট মাছ ও পোনামাছ এসব জালে আটকা পড়ায় মাছের বংশবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া, উত্তর চরপুক্ষিয়া, চকবাজার, পাইকান সেতুসংলগ্ন এলাকা, লোহাজুরীর পূর্বচর পাড়াতলা এবং পোড়াদিয়া সেতু পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে এসব জালের বাঁধ দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নদটির অপর পাড়ে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার চরগোহালবাড়িয়া, পাইকান ও বড়চাপা এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে। বিস্তৃত এলাকাজুড়ে জালের উপস্থিতি নদটির পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং নৌপথের ব্যবহার নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সজল বলেন, নদটির এক পাড় থেকে অন্য পাড় পর্যন্ত লম্বা জাল টানিয়ে মাছ শিকার করতে দেখা যাচ্ছে। এসব জালে পোনামাছসহ বিভিন্ন ধরনের জলজ প্রাণী উঠে আসে। তাঁর মতে, কয়েকজন মাছ শিকার করে তাৎক্ষণিকভাবে লাভবান হলেও এভাবে নির্বিচারে মাছ ধরা চলতে থাকলে নদটির মাছের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ কমে গেলে ভবিষ্যতে স্থানীয় মানুষও এর প্রভাব অনুভব করবেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

দক্ষিণ চরপুক্ষিয়ার কৃষক আফাজ উদ্দিনও নদে মাছ কমে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, জালের বাঁধে ছোট-বড় নানা ধরনের মাছ আটকা পড়ায় সাধারণ মানুষ আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। আগে ঠেলা জাল নিয়ে নদে গেলে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, এখন তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান। স্থানীয় মানুষের এ অভিজ্ঞতা নদটির মৎস্যসম্পদের পরিবর্তন সম্পর্কে উদ্বেগের কথা তুলে ধরে। তবে মাছের পরিমাণ কতটা কমেছে, কোন কোন প্রজাতি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর পেছনে জালের বাঁধের ভূমিকা কতটা—এসব নির্ধারণে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

জালের বাঁধের প্রভাব শুধু মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নদটি দিয়ে চলাচলকারী মালবাহী নৌযানও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে। সরেজমিনে প্লাস্টিকের পাইপবোঝাই একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকাকে জালের কারণে আটকে থাকতে দেখা গেছে। নদপথে পণ্য পরিবহন অনেক ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের বাধা নিয়মিত তৈরি হলে নৌযান চলাচলে বিলম্ব, পণ্য পরিবহনে অসুবিধা এবং অতিরিক্ত সময় ও ব্যয়ের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি জালের কাঠামো এড়িয়ে চলতে গিয়ে নৌযান চালকদের সতর্ক থাকতে হয়, যা নদপথের নিরাপদ চলাচলের জন্যও বিবেচ্য বিষয়।

প্রবহমান নদে এভাবে জালের বাঁধ দিয়ে মাছ শিকারের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কটিয়াদী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. কাউছার মিয়া। তিনি বলেন, প্রবহমান নদে জালের বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা যাবে না এবং কারেন্ট জাল ব্যবহারও নিষিদ্ধ। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নদে জাল বসিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মনোহরদী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. রাফি আফরোজ সনি জানান, তাঁদের এলাকায় এর আগে অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে নতুন করে বিভিন্ন স্থানে জালের বাঁধ দেওয়ার বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। অন্যদিকে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, প্রবহমান নদে জালের বাঁধ দেওয়া যাবে না। অবৈধ জাল পাওয়া গেলে অভিযান পরিচালনা করা হবে। মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন।

কর্তৃপক্ষের এসব বক্তব্যের পর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। শুধু অভিযান পরিচালনার ঘোষণা নয়, নদটির কোন কোন অংশে কতটি জালের বাঁধ রয়েছে, কারা সেগুলো স্থাপন করেছে এবং কোন ধরনের জাল ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব তথ্য যাচাই করে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। যেহেতু নদটি দুই উপজেলার সীমানাঘেঁষে প্রবাহিত, তাই কটিয়াদী ও মনোহরদী প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় থাকলে পুরো এলাকাজুড়ে কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হতে পারে। এক উপজেলার অংশে ব্যবস্থা নেওয়ার পর পাশের এলাকায় একই ধরনের জাল থেকে গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে।

নদীর মৎস্যসম্পদ রক্ষায় পোনামাছ ও প্রজননক্ষম মাছের সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই জালে ধরা পড়লে ভবিষ্যতে নদে মাছের স্বাভাবিক মজুত বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা, নদে মাছের চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখা এবং মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণসংক্রান্ত বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি ও স্থানীয় মানুষের সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও একই স্থানে জালের বাঁধ স্থাপন না করা হয়।

স্থানীয় জেলেদের জীবিকার বিষয়টিও এ সমস্যার সঙ্গে জড়িত। নদে মাছ কমে গেলে বৈধ পদ্ধতিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে অবৈধভাবে মাছ শিকার বন্ধের পাশাপাশি নিয়ম মেনে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। নদকে কেন্দ্র করে যাঁদের জীবিকা গড়ে উঠেছে, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সমস্যা শনাক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে।

আড়িয়াল খাঁ নদের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত ২০টি জালের বাঁধ থাকার অভিযোগ তাই কেবল অবৈধ মাছ শিকারের বিষয় নয়; এটি নদীর পরিবেশ, মৎস্যসম্পদের ভবিষ্যৎ, স্থানীয় মানুষের জীবিকা এবং নৌপথে পণ্য পরিবহনের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সংশ্লিষ্ট দুই উপজেলার প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের ঘোষিত পদক্ষেপ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর পরিস্থিতির উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, নদটির বিভিন্ন স্থানে থাকা অবৈধ জালের বাঁধ অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতে নদে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননের সুযোগ রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি নৌযান চলাচলও নির্বিঘ্ন হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com