প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র সচিবালয় রাজধানীর আবদুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলানগরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন সচিবালয় নির্মাণের প্রকল্প প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছে। পাশাপাশি নতুন ভবনগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করে একটি প্রাথমিক নকশা বা লে-আউট তৈরি করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাব তৈরির কাজও চলছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রশাসনিক অবকাঠামো ও সরকারি দপ্তরগুলোর অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্তমানে রাজধানীর আবদুল গনি রোডে অবস্থিত সচিবালয় বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজ, নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে এই স্থাপনা সরাসরি যুক্ত। তাই সচিবালয়ের অবস্থান পরিবর্তনের পরিকল্পনা কেবল একটি সরকারি ভবন স্থানান্তরের বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ, নাগরিকদের সেবা গ্রহণ এবং রাজধানীর নগর পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িয়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় নতুন সচিবালয় নির্মাণ ও স্থানান্তরসংক্রান্ত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও পরিকল্পনাগত কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বর্তমান সচিবালয় এলাকায় নতুন কোনো ভবন নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ আবদুল গনি রোডের বিদ্যমান সচিবালয় প্রাঙ্গণে নতুন ভবন নির্মাণ করে বর্তমান স্থাপনাকে আরও সম্প্রসারণের পরিবর্তে প্রশাসনিক কেন্দ্রটি অন্য স্থানে স্থানান্তরের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। তবে বর্তমান সচিবালয়ের ভবনগুলো ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেগুলোর কোনো অংশ সংরক্ষণ করা হবে কি না কিংবা স্থানান্তর কার্যক্রম কোন ধাপে সম্পন্ন হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্তের কথা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
নতুন সচিবালয়ের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে রাজধানীর শেরেবাংলানগরকে নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য প্রাথমিক অবস্থান বিন্যাস তৈরি করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এই প্রাথমিক লে-আউটে প্রস্তাবিত ভবনগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক নকশা তৈরি হওয়া মানেই নির্মাণকাজ শুরু হয়ে গেছে, এমন নয়। প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন, অর্থায়ন, নকশা চূড়ান্তকরণ, নির্মাণ পরিকল্পনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপগুলো নির্ধারিত হবে।
নতুন সচিবালয় নির্মাণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি তৈরির কাজ চলছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ডিপিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। এতে সাধারণত প্রকল্পের উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য ব্যয়, বাস্তবায়নের সময়সীমা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অর্থায়নের উৎস এবং প্রত্যাশিত ফলাফলের মতো বিষয় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। সচিবালয়ের মতো বড় প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের পরিধি ও ব্যয় নির্ধারণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। কারণ এ ধরনের প্রকল্পে শুধু ভবন নির্মাণ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ তৈরির বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।
প্রকল্পটি এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। এর পরবর্তী ধাপে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটি নিয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে। এমন সভায় সাধারণত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মতামত, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়। তবে প্রকল্পটির চূড়ান্ত ব্যয়, নির্মাণের সময়সীমা কিংবা অনুমোদনের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের নকশা দেখেছেন এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। সেসব পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এতে বোঝা যায়, প্রকল্পটির প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে কাজ চলছে। তবে চূড়ান্ত নকশা, অনুমোদিত প্রকল্প কাঠামো এবং নির্মাণ শুরুর সময় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেতে পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।
সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনার সঙ্গে রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। বর্তমান সচিবালয় রাজধানীর একটি ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত। সরকারি দপ্তরে প্রতিদিন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন কাজে নাগরিক, ব্যবসায়ী, সেবাপ্রার্থী ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যাতায়াত থাকে। গুরুত্বপূর্ণ সভা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজে যাতায়াতের চাপও তৈরি হয়। নতুন স্থানে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত মানুষের যাতায়াতের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। তবে এতে যানজট কমবে কি না, তা নির্ভর করবে নতুন স্থানের যোগাযোগব্যবস্থা, সড়কের ধারণক্ষমতা, গণপরিবহনের সুযোগ এবং সরকারি দপ্তরগুলোর অবস্থানগত বিন্যাসের ওপর।
শেরেবাংলানগরে নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা ও জনসাধারণের প্রবেশগম্যতা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা মানুষের একটি অংশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন, আবার অনেককে রাজধানীর বাইরের জেলা থেকেও আসতে হয়। নতুন সচিবালয়ে যাতায়াত সহজ না হলে তাঁদের সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে। তাই প্রকল্পের পরিকল্পনায় গণপরিবহনের সংযোগ, পর্যাপ্ত প্রবেশপথ, পথচারীদের চলাচল, যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং সেবাপ্রার্থীদের প্রয়োজন বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
একই সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রম যেন স্থানান্তরের সময় ব্যাহত না হয়, সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নথিপত্র, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা, দাপ্তরিক সরঞ্জাম এবং নিয়মিত সেবা কার্যক্রম নতুন স্থানে স্থানান্তরের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে। স্থানান্তরের সময় কোন দপ্তর আগে যাবে, কোন কার্যক্রম কীভাবে চলবে এবং নাগরিকেরা কীভাবে প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন—এসব বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি থাকলে সাময়িক বিঘ্ন কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে সরকার এখন পর্যন্ত কী ধরনের বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে স্পষ্ট নয়।
নতুন সচিবালয় নির্মাণে সরকারি অর্থের ব্যবহারও জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যয়ের যৌক্তিকতা, নির্মাণের মান, সময়মতো কাজ শেষ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা নির্ধারণের সময় বাস্তব চাহিদা এবং ভবিষ্যতের প্রশাসনিক প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে ভবনগুলোকে কার্যকর, নিরাপদ এবং আধুনিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের উপযোগী করে গড়ে তোলার বিষয়ও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়ার কথা।
সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত এখনো প্রকল্প প্রণয়ন ও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। ডিপিপি প্রস্তুত, এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা কমিশনের সম্ভাব্য আন্তমন্ত্রণালয় সভা—এসব ধাপের মাধ্যমে প্রকল্পটি পরবর্তী পর্যায়ে এগোবে। চূড়ান্ত অনুমোদন, প্রকল্প ব্যয়, নির্মাণ শুরুর সময় এবং স্থানান্তর সম্পন্ন করার সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হলে পরিকল্পনার বাস্তব রূপ আরও স্পষ্ট হবে।
দেশের প্রশাসনিক প্রধান কার্যালয় নতুন স্থানে নেওয়ার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর সরকারি অবকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রকল্পটির সাফল্য শুধু নতুন ভবন নির্মাণের ওপর নির্ভর করবে না; বরং প্রশাসনিক দক্ষতা, নাগরিক সেবার সহজলভ্যতা, যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং স্থানান্তর-পরবর্তী কার্যক্রম কতটা নির্বিঘ্ন রাখা যায়, তার ওপরও নির্ভর করবে। তাই পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে বাস্তব প্রয়োজন, জনস্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত