নারী-শিশু নির্যাতনে জিরো টলারেন্স চান রাষ্ট্রপতি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৬ বার
নারী-শিশু নির্যাতনে জিরো টলারেন্স চান রাষ্ট্রপতি

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির মতো অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এসব অপরাধের দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ক্ষেত্রে সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর বক্তব্যে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের দায়িত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। অনুষ্ঠানে তিনি দেশের শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দায়িত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি সমাজের নিরাপত্তা, মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা যখন বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অনলাইন পরিসরে হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকে, তখন তাদের স্বাভাবিক বিকাশ, শিক্ষা গ্রহণ এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির ঘটনাগুলোর দ্রুত তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য নয়। তবে জিরো টলারেন্স নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন কেবল কঠোর বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মতো বাস্তব ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সামাজিক চাপ, ভয়, হয়রানির আশঙ্কা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অনিশ্চয়তার কারণে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করতে পারেন। তাই অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা সহজ করা, ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং তদন্ত চলাকালে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা অপরাধ প্রতিরোধের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হতে পারে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর বিচারের ওপর জোর দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ ধরনের পদক্ষেপের গুরুত্বও সামনে আসে।

কন্যাশিশুর নিরাপত্তার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিদ্যালয় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এই বক্তব্যে শিশুদের নিরাপত্তার পরিধি যে শুধু বাড়ি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা স্পষ্ট হয়েছে। বর্তমানে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ অনলাইন যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। ফলে অনলাইন হয়রানি, অনুপযুক্ত যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো ক্ষতিকর আচরণ থেকে শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিরাপদ রাখা কন্যাশিশুর শিক্ষা অব্যাহত রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু যদি বিদ্যালয়ে যাওয়া, বাড়ি ফেরা কিংবা পথে চলাচলের সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে তার শিক্ষা ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। নিরাপদ যাতায়াত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিক্ষক ও কর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ শিশুদের সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে শিশুদের সচেতন করা এবং অভিভাবকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেওয়াও প্রয়োজন।

শিশুবিয়ে প্রতিরোধের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, অবৈতনিক শিক্ষা, উপবৃত্তি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন যাচাই ও কন্যাশিশুর উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে বাল্যবিবাহের পেছনে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।

বাল্যবিবাহের ঝুঁকি কমাতে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; পরিবার ও সমাজের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশুর শিক্ষা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিক্ষার ব্যয়, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু পরিবার কন্যাশিশুর অল্প বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ, উপবৃত্তি, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

জন্মনিবন্ধন যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিয়ের ক্ষেত্রে বয়স যাচাই সঠিকভাবে করা গেলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে ঠেকানোর সুযোগ বাড়ে। তবে এ জন্য জন্মনিবন্ধনের তথ্য নির্ভুল রাখা, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর নজরদারি জরুরি। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সচেতনতা বাড়ানো গেলে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে।

কন্যাশিশুর উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর রাষ্ট্রপতির গুরুত্বারোপও তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা শুধু ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে না; এটি শিশুর আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। কন্যাশিশুরা যাতে আর্থিক বা সামাজিক কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে, সে জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার, আর্থিক সহায়তা এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষার সুযোগ বাড়লে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি সমাজে নারীর অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পথও প্রসারিত হতে পারে।

অনুষ্ঠানে কুমিল্লার শিক্ষার্থী তাজমিন হত্যার প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিছিয়েও যাচ্ছে। সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের নজর রাখার দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কুমিল্লার মেয়েটি তিন দিন বাড়িতে ছিল না, অথচ অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা যায়নি। তাঁর এই বক্তব্যে শিশুদের চলাফেরা, নিরাপত্তা এবং পরিবারের নজরদারির বিষয়টি সামনে এসেছে।

তবে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু অভিভাবকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। পরিবারের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোনো শিশু নিখোঁজ হলে বা বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত সহায়তা পাওয়া, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত সাড়া দেওয়াও সমান জরুরি। শিশুদের সঙ্গে পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগ, তাদের চলাফেরা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং বিপদের পরিস্থিতিতে কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে সে বিষয়ে ধারণা দেওয়া নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে। একই সঙ্গে শিশুর স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিকাশের প্রয়োজনের সঙ্গে দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, যখন স্কুলের পাশে মায়েরা কাগজ বিছিয়ে বসে সন্তানকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করেন, তখনই বোঝা যায় সমাজ কতটা অনিরাপদ। তাঁর এই মন্তব্যে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। সন্তানের বিদ্যালয়ে যাওয়া ও বাড়ি ফেরার সময় অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা যদি নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়, তাহলে তা পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের আশপাশে নিরাপদ পরিবেশ, শিশুদের যাতায়াতের ঝুঁকি চিহ্নিত করা, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পাওয়া এবং শিশুদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে শোনার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটলে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ প্রতিরোধে আস্থা তৈরি হতে পারে।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে অপরাধের দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার ও আইনের কঠোর প্রয়োগ; অন্যদিকে দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষার সুযোগ, উপবৃত্তি, সামাজিক সুরক্ষা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ—এই দুই ধারার উদ্যোগ একে অপরের পরিপূরক। শিশুদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কন্যাশিশুরা ভয় ছাড়াই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে এবং পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com