প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম আবারও বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির নেতারা ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে উল্লেখ করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এ দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে যখন সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে, তখন রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানির দাম আবার বাড়ানো মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নভেম্বর মাসের জন্য বেসরকারিভাবে বাজারজাত এলপিজির নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০ টাকা হয়েছে। নতুন মূল্য ২ নভেম্বর রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকবে।
একই সঙ্গে এলপিজির অন্যান্য আকারের সিলিন্ডারের দামও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও প্রতি লিটারে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বেড়ে ৯১ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিইআরসির নতুন মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সৌদি আরামকো কন্ট্রাক্ট প্রাইসসহ বিভিন্ন উপাদান বিবেচনা করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে মাত্র দুই মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ৪৭৫ টাকা বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবর মাসে তা ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। নভেম্বর মাসে আরও ২২৩ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা।
ছাত্রশিবিরের নেতারা বিবৃতিতে বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের কারণে এমনিতেই চাপে রয়েছেন। এর মধ্যে রান্নার জন্য ব্যবহৃত এলপিজির দাম বারবার বাড়ানোর ফলে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় আরও বাড়বে। বিশেষ করে যেসব পরিবার পাইপলাইনের গ্যাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং রান্নার জন্য সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়বে বলে তাঁরা মনে করেন।
সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, গত আট মাসে পাঁচ দফায় এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। তাঁদের মতে, এভাবে ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ যখন খাবার, বাসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়, তখন রান্নার জ্বালানির খরচ বেড়ে গেলে অন্যান্য খাতেও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ছাত্রশিবিরের বিবৃতিতে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটির নেতাদের ভাষ্য, দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার এখন রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিকল্প জ্বালানির পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় এলপিজির দাম বাড়লে সাধারণ ভোক্তাদের সামনে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য কোনো সাশ্রয়ী বিকল্প খুঁজে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিইআরসি আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় কাঠামো বিবেচনা করেছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের জন্য বেসরকারি এলপিজির ভোক্তা পর্যায়ের দাম প্রতি কেজি ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌদি আরামকোর সর্বশেষ কন্ট্রাক্ট প্রাইস এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের ভিত্তিতে এই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগও সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু এলাকায় ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নতুন করে সরকারি মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ভোক্তাদের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি করতে পারে—এমন উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন পক্ষ।
ছাত্রশিবিরের নেতারা তাঁদের বিবৃতিতে দাবি করেছেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। তাঁদের অভিযোগ, এলপিজি আমদানি ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত কিছু অসাধু ব্যবসায়িক চক্রের স্বার্থ রক্ষায় ভোক্তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। তবে এটি ছাত্রশিবিরের অভিযোগ; অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
এলপিজির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বাসাবাড়ির রান্নার খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার রয়েছে। ফলে জ্বালানির ব্যয় বাড়লে খাবার প্রস্তুতের খরচও বাড়তে পারে। ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে পণ্যের দাম বাড়ালে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়ার আশঙ্কা থাকে।
ছাত্রশিবিরের নেতারা এ কারণেই এলপিজির বাজারকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শুধু সরকারি মূল্য নির্ধারণ করলেই বাজারে ভোক্তারা নির্ধারিত দামে পণ্য পাচ্ছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকটের মতো কোনো অনিয়ম থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের পাশাপাশি এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের কমিশন ও চার্জ পুনর্নির্ধারণের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বিইআরসির গণশুনানিতে এলপিজি অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের চার্জ ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী মূল্য নির্ধারণে এসব বিষয়সহ আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এ অবস্থায় ছাত্রশিবির সরকারের প্রতি এলপিজির বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাজার মনিটরিং জোরদার করে ভোক্তারা যেন নির্ধারিত দামে এলপিজি কিনতে পারেন, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বাজারে কোনো অসাধু সিন্ডিকেট বা অনিয়ম থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তারা বলেছে।
সাধারণ মানুষের জন্য রান্নার জ্বালানি কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশ। তাই এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক মূল্য এবং ভোক্তা সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। সামনে এলপিজির বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি কীভাবে থাকে এবং নির্ধারিত দামে ভোক্তারা সিলিন্ডার পান কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ছাত্রশিবিরের দাবি, মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে সাধারণ মানুষের জন্য এলপিজি আরও সাশ্রয়ী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং সরবরাহসংক্রান্ত অনিয়ম কমানো সম্ভব হবে। অন্যদিকে মূল্য নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষের হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহ ব্যয়ের পরিবর্তনও মূল্য সমন্বয়ের অন্যতম কারণ। ফলে এলপিজির দাম নিয়ে চলমান বিতর্কে ভোক্তার সামর্থ্য, বাজার বাস্তবতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত