বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চুক্তিতে জাপানি পক্ষকে বড় ছাড়

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চুক্তিতে জাপানি পক্ষকে বড় ছাড়

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও প্রস্তাবিত চুক্তির কয়েকটি বিতর্কিত শর্তে সরকার সম্মতি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। এর মধ্যে রাজস্ব ভাগাভাগি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনের প্রভাব, নির্মাণগত ত্রুটির দায় এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

একই সঙ্গে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে আগামী ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রাখার বিষয়েও সম্মতি দেওয়ার কথা জানা গেছে। এই শর্তটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, দেশের ভবিষ্যৎ বিমান চলাচল অবকাঠামো পরিকল্পনা, নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের সুযোগ এবং ঢাকাকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য—সবকিছুর ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

থার্ড টার্মিনালকে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন অবকাঠামোর বড় একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, বাড়তি যাত্রীসেবা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনব্যবস্থার মাধ্যমে ঢাকার বিমানবন্দরকে আরও সক্ষম করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে এই প্রকল্পের পেছনে। তবে একটি আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি বিমান ওঠানামার জন্য পর্যাপ্ত রানওয়ে সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পরিচালনা চুক্তিতে এমন কোনো শর্ত যুক্ত হলে, যা ভবিষ্যতে বিকল্প বিমানবন্দর বা নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিক থেকে আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনায় চারটি বিষয়ে বিরোধ ছিল। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামো, বাংলাদেশের আইন পরিবর্তিত হলে চুক্তির ওপর তার প্রভাব, নির্মাণগত ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের দায় বহনের সময়সীমা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তিগত সম্পর্ক। এসব বিষয়ে সরকার কিছুটা ছাড় দিয়ে সমঝোতার দিকে এগিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে চুক্তির চূড়ান্ত ভাষা, আর্থিক হিসাব এবং প্রতিটি শর্তের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়টি চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আলোচ্য কাঠামো অনুযায়ী থার্ড টার্মিনাল থেকে সংশ্লিষ্ট রাজস্বের ২৭ শতাংশ বাংলাদেশের পাওয়ার কথা। তবে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে প্রস্তুতিমূলক ও আংশিক পরিচালনার সময় এই হার কার্যকর হবে না। প্রাথমিকভাবে আট মাসের পরিচালনাগত প্রস্তুতি পর্বে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব ছিল বলে জানা গেছে। এই হার চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

তবে রাজস্বের হার সাময়িকভাবে কম থাকলেও এর আর্থিক প্রভাব নির্ভর করবে ওই সময়ে বিমানবন্দরে যাত্রী চলাচল, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও অন্যান্য আয়ের পরিমাণের ওপর। থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়ার পর যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রী ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তরিত হয়, তাহলে প্রস্তুতিমূলক সময়ের রাজস্ব ভাগাভাগির হার নিয়ে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক গুরুত্ব তৈরি হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু না করার শর্ত। চুক্তির অংশ হিসেবে এমন বিধান থাকলে তা কেবল বর্তমান থার্ড টার্মিনালের পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ভবিষ্যৎ বিমান পরিবহন অবকাঠামো পরিকল্পনার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে সক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঢাকার চারপাশে দ্রুত নগরায়ণ ও জনবসতি সম্প্রসারণের কারণে ভবিষ্যতে নতুন রানওয়ে বা সম্পূর্ণ নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া সহজ নয়। ফলে যাত্রী ও উড়োজাহাজ চলাচল বাড়তে থাকলে শুধু টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে পরিকল্পনাবিদদের ভাবতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, একটি আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব গড়ে তুলতে শুধু আধুনিক টার্মিনাল যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত রানওয়ে, উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা, দ্রুত যাতায়াত ব্যবস্থা, কার্গো অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগও প্রয়োজন। তাই একটি পরিচালনা চুক্তির মেয়াদে নতুন প্রতিযোগী বিমানবন্দর নিয়ে সীমাবদ্ধতা থাকলে তা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার স্বাধীনতার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

উইং কমান্ডার (অব.) নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনায় দর-কষাকষির অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারত যদি একাধিক সম্ভাব্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান থাকত। তবে একক আলোচনার পরিস্থিতিতেও ভালোভাবে দর-কষাকষি করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

চুক্তিতে বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানি পক্ষ বিশেষ আইনি সুরক্ষার দাবি তুলেছিল বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল, ভবিষ্যতে সরকার দেশের সব বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাধারণ কোনো আইন প্রণয়ন কিংবা বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করলে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ আইনি কাঠামোর বাইরে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আপত্তি ছিল।

নির্মাণগত ত্রুটি বা ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্যের কথা জানা গেছে। বাংলাদেশ ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের জন্য নয় মাসের সময়সীমার পক্ষে থাকলেও জাপানি পক্ষ ১২ মাসের সময়সীমা চেয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোন শর্তে সমঝোতা হয়েছে, তা চুক্তির চূড়ান্ত নথি প্রকাশের পর আরও পরিষ্কার হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিমানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সার্বিক দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি বহন করতে হতে পারে। অন্যদিকে বিমানবন্দরের সামগ্রিক পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে। এ ধরনের কাঠামোয় দুই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, ঝুঁকি ও আয়-ব্যয়ের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।

চুক্তির বর্তমান অবস্থায় আরও কিছু প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। সংশোধিত কনসেশন চুক্তির ধারাগুলো পর্যালোচনার জন্য জাপানি পক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও নভেম্বরের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি শেষ করার প্রত্যাশা রয়েছে।

থার্ড টার্মিনাল পরিচালনায় বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থও সুরক্ষিত রাখা। একটি আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল পরিচালনার জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ অংশীদার প্রয়োজন হলেও চুক্তির প্রতিটি শর্ত ভবিষ্যতের বিমান পরিবহন খাতের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

এককভাবে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা হলে দর-কষাকষির ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—এমন সতর্কতা আগেও এসেছে। বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমানের বক্তব্যেও বিকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সম্ভাব্য বিকল্প না থাকলে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে।

সবশেষে, থার্ড টার্মিনাল শুধু একটি নতুন যাত্রী টার্মিনাল নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিমান পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ফলে পরিচালনা চুক্তির শর্তগুলো কেবল বর্তমান আর্থিক লাভ-ক্ষতির দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, আগামী এক থেকে দুই দশকের বিমান চলাচল, নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব, আইনগত স্বাধীনতা এবং জাতীয় অবকাঠামো পরিকল্পনার দিক থেকেও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। চুক্তির চূড়ান্ত ভাষা ও পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশিত হলে সরকারের দেওয়া ছাড়ের প্রকৃত আর্থিক ও কৌশলগত প্রভাব আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com