সর্বশেষ :

ক্যালিফোর্নিয়ার ২০ হাজার ব্যালট নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন খারিজ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
ক্যালিফোর্নিয়ার ২০ হাজার ব্যালট নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন খারিজ
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ডাকযোগে পাঠানো প্রায় ২০ হাজার ব্যালট আলাদা করে রাখার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিনেই আদালতের এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভোটের প্রতিটি ব্যবস্থাপনা যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে, তখন ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট নিয়ে এই বিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নাগরিক অধিকার এবং কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ ছিল, ক্যালিফোর্নিয়ায় ডাকযোগে পাঠানো প্রায় ২০ হাজার ব্যালটের সঙ্গে এমন ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন। তাঁদের কেউ কেউ অবৈধভাবে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশাসন। এই যুক্তির ভিত্তিতে মার্কিন বিচার বিভাগ সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করে, যাতে ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন কর্মকর্তাদের এসব ব্যালট আলাদা করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করেননি। ফলে নির্বাচনের আগে ব্যালটগুলো পৃথক করার যে উদ্যোগ নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন, তা আর বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

এই মামলার গুরুত্ব শুধু ২০ হাজার ব্যালটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব যাচাই, ডাকযোগে ভোট গ্রহণ এবং নির্বাচনের দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে থাকা—এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ভোটের নিরাপত্তা ও জালিয়াতির অভিযোগ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তিনি বারবার দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী জালিয়াতি ব্যাপকভাবে ঘটে এবং অভিবাসীদের অবৈধভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত জালিয়াতির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

ট্রাম্প প্রশাসন ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাকে বিশেষভাবে সমালোচনা করে আসছে। দেশটির বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোটারদের ডাকযোগে ব্যালট পাঠিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই পদ্ধতিতে ভোটাররা নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে বাড়ি থেকেই ভোট দিতে পারেন। বিশেষ করে বয়স্ক, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী কিংবা কর্মসূত্রে দূরে অবস্থান করা নাগরিকদের জন্য ডাকযোগে ভোট গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থা। তবে ব্যালট বিতরণ, ভোটারের পরিচয় যাচাই, স্বাক্ষর পরীক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যালট ফেরত পাওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ। দেশটির অন্যতম বৃহৎ এই অঙ্গরাজ্যে ডাকযোগে ভোটের ব্যবস্থা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে প্রায় ২০ হাজার ব্যালট আলাদা করে রাখার আবেদনটি সংখ্যার দিক থেকে মোট নিবন্ধিত ভোটারের তুলনায় ছোট হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্য অনেক বেশি। বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে এ ধরনের আইনি উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারত বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগে কয়েকটি নিম্ন আদালতও ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচন কর্মকর্তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এসব আদালতের যুক্তি ছিল, অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নির্বাচন পরিচালনা, ভোটার নিবন্ধন এবং ব্যালট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোর নিজস্ব সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে চাইলে তার আইনি ভিত্তি ও প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের ক্ষমতার ভারসাম্যসংক্রান্ত বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যবস্থায় নির্বাচন পরিচালনার বড় দায়িত্ব অঙ্গরাজ্যগুলোর ওপর ন্যস্ত। তবে জাতীয় নির্বাচনে ফেডারেল আইন, নাগরিকত্বের শর্ত এবং ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা রয়েছে। ফলে কোনো অঙ্গরাজ্যের ভোটার বা ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা কীভাবে তদন্ত করা হবে এবং কোন পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে, তা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি ভোটারদের আস্থার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, তাঁদের দেওয়া ভোট যথাযথভাবে গণনা করা হবে এবং কোনো বৈধ ভোট অযৌক্তিকভাবে বাদ পড়বে না। একই সঙ্গে যাঁরা আইনগতভাবে ভোট দেওয়ার যোগ্য নন, তাঁদের ভোট যেন নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই দুই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছ যাচাইপ্রক্রিয়া এবং অভিযোগ তদন্তের গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা অপরিহার্য।

বিভিন্ন গবেষণা ও অঙ্গরাজ্য সরকারের নিরীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে অ-মার্কিন নাগরিকসহ ভোটার নন—এমন ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। নাগরিকত্বের শর্ত পূরণ না করলে সাধারণত ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার পাওয়া যায় না। এ কারণে বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন হলেও তার ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হয়। নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে যেন যোগ্য ভোটারদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক শর্ত।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন প্রশাসনের জনপ্রিয়তা, নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে, নাকি ডেমোক্রেটিক পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে সক্ষম হবে, তা নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে।

এবার প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হচ্ছে। অন্যদিকে সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত ২১৮টি আসন প্রয়োজন। ফলে কয়েকটি আসনের ফলাফলই কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি। অন্যদিকে দুজন স্বতন্ত্র সিনেটরের সমর্থনসহ ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ৪৫। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য সাধারণভাবে ৫১টি আসন প্রয়োজন হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় ৪০টি আসন এবং সিনেটের ১০ থেকে ১২টি আসন নিয়ে দুই দলের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। এসব আসনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যালট আলাদা করার আবেদন এবং সুপ্রিম কোর্টের তা খারিজ করার সিদ্ধান্ত নির্বাচনী বিতর্ককে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। নির্বাচনের ফল নিয়ে দুই দলের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেমন তীব্র, তেমনি ভোটারদের আস্থা বজায় রাখাও দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় পরীক্ষা। আদালতের সিদ্ধান্তে ক্যালিফোর্নিয়ার ওই ব্যালটগুলো আলাদা করার উদ্যোগ আপাতত থেমেছে। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটারদের অধিকার এবং নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক যে অব্যাহত থাকবে, সাম্প্রতিক ঘটনাটি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই নির্বাচনের ফল শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা বদলাবে না; আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন কতটা নির্বিঘ্নে নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেটিও অনেকাংশে নির্ভর করবে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। তাই ক্যালিফোর্নিয়ার ব্যালট নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলও এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com