প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখম এবং তাঁর দোকান থেকে নগদ টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে মোহনগঞ্জ পৌর শহরের খাদ্যগুদামের বিপরীতে পিংকী সাইকেল স্টোরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় দোকানটির মালিক সবুজ মিয়া আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে ক্যাশে থাকা এক লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আবদুল্লাহ আল সোহান নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাটি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একটি দোকানে ঢুকে ব্যবসায়ীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত, ভাঙচুর এবং নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ শুধু একজন ব্যবসায়ীর নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ছোট দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে দোকানের নগদ অর্থই অনেক সময় তাঁদের দৈনন্দিন আয়, পুঁজি এবং পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে আবদুল্লাহ আল সোহান কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে পিংকী সাইকেল স্টোরে যান। এ সময় তিনি ব্যবসায়ী সবুজ মিয়ার কাছে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সবুজ মিয়া টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। এরপর দোকানে ভাঙচুর চালানো হয় এবং ক্যাশে রাখা নগদ এক লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে সোহান ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
হামলার সময় দোকানের আশপাশে থাকা কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আহত সবুজ মিয়াকে চিকিৎসার জন্য মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া না গেলেও হামলার ঘটনায় তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতেই সবুজ মিয়ার ছোট ভাই মোহাম্মদ কমল মিয়া বাদী হয়ে মোহনগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে রাতেই আবদুল্লাহ আল সোহানকে গ্রেপ্তার করে। শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তার সোহান মোহনগঞ্জ উপজেলার বড়কাশিয়া গ্রামের মৃত নূর আহম্মদের ছেলে।
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ব্যবসায়ীকে আহত করা ও দোকানে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আবদুল্লাহ আল সোহানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা রয়েছে বলেও জানান ওসি।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোহানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ছিনতাই, মাদক ও মারামারিসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। তবে এসব মামলার অস্তিত্ব বা অভিযোগ থাকলেই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। চলমান মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই প্রতিটি অভিযোগের আইনি অবস্থান নির্ধারিত হবে। বর্তমান ঘটনায়ও গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
এদিকে ঘটনার পেছনে আরেকটি বিরোধের বিষয় সামনে এসেছে স্থানীয় লোকজনের বক্তব্যে। তাঁদের দাবি, মোহনগঞ্জ পৌর শহরের খাদ্যগুদাম-সংলগ্ন একটি সেতু পুনর্নির্মাণের সময় সরকারি জায়গায় থাকা কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। ওই সময় সরকারি জায়গার কিছু অংশ দখল করে সেখানে ঘর নির্মাণ করেন আবদুল্লাহ আল সোহান বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পরে সেই ঘর সবুজ মিয়ার কাছে মাসিক আট হাজার টাকা ভাড়ায় দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাড়ার টাকা এবং অর্থ লেনদেন নিয়ে সবুজ মিয়ার সঙ্গে সোহানের বিরোধ চলছিল। তাঁদের অভিযোগ, সোহান প্রায়ই সবুজ মিয়ার কাছে টাকা চাইতেন। ঘটনার দিন ভাড়ার টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে সোহান কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে দোকানে গিয়ে সবুজ মিয়ার ওপর হামলা চালান বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
তবে স্থানীয়দের দেওয়া এই বক্তব্য এবং মামলার এজাহারে উল্লেখ করা চাঁদা দাবির অভিযোগের মধ্যে ঘটনার কারণ ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। মামলার এজাহারে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশ ভাড়া ও অর্থ লেনদেন নিয়ে বিরোধের কথা জানিয়েছেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে এসব বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং অন্যান্য প্রমাণ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো একটি বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন হবে না।
ঘটনার সঙ্গে দোকান ভাঙচুর ও এক লাখ ২০ হাজার টাকা লুটের অভিযোগও জড়িত। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এ ধরনের আর্থিক ক্ষতি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটি দোকানের দৈনন্দিন বেচাকেনা থেকে জমা হওয়া অর্থ দিয়ে পণ্য কেনা, দোকানভাড়া দেওয়া, কর্মচারীদের পারিশ্রমিক পরিশোধ এবং পরিবারের খরচ চালানো হয়। ফলে দোকানের নগদ টাকা হারানোর পাশাপাশি মালিকের আহত হওয়ার ঘটনা তাঁর ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। চিকিৎসার ব্যয় ও দোকানের ক্ষয়ক্ষতি যুক্ত হলে আর্থিক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চাঁদাবাজি, হামলা ও দোকানপাটে ভাঙচুরের মতো অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো ব্যবসায়ী বা দোকানমালিকের সঙ্গে ভাড়া, অর্থ লেনদেন কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ দেখা দিলে তা আইনসম্মত উপায়ে সমাধানের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। বিরোধের জেরে সহিংসতা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নন; আশপাশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
মোহনগঞ্জের এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মামলার প্রাথমিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিলেন, হামলার সময় ঠিক কী ঘটেছিল, দোকান থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে এবং বিরোধের প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয় তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আহত ব্যবসায়ী সবুজ মিয়ার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
একজন ব্যবসায়ীর কর্মস্থলে এমন হামলার অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে মানুষ যেন চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি কিংবা সহিংসতার আশঙ্কা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই এ ধরনের ঘটনার প্রতিকার সম্ভব। এখন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও তাঁর পরিবারের প্রত্যাশা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত