পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হোসেনের বিরুদ্ধে এক তরুণীকে ধর্ষণ, বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন, মানসিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী তরুণীর দাবি, সম্পর্কের একপর্যায়ে তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর পর থেকে তিনি ও তাঁর পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও দাবি করেছেন। তবে অভিযুক্ত ওসি এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রায় দেড় মাস আগে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন ওই তরুণী। কিন্তু অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসে গত শুক্রবার। অভিযোগ জমা দেওয়ার পরও তদন্ত শেষ না হওয়ায় এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার প্রভাবের আশঙ্কায় তরুণী ও তাঁর পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিকভাবে বাসা থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তরুণীর লিখিত অভিযোগের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় এক বছর পাঁচ মাস আগে ইফতেখার হোসেন কাশিমপুর থানায় কর্মরত থাকাকালে একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ নিয়ে তিনি ওই থানায় যান। সে সময় ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তরুণীর দাবি, সম্পর্ক চলাকালে ইফতেখার হোসেন নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেন। একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তা তাঁকে তাঁর বন্ধু সোহেলের বাসায় নিয়ে যেতেন এবং সেখানে তাঁদের শারীরিক সম্পর্ক হতো বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তাঁকে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে বলা হয়। কিন্তু পরে ওই কর্মকর্তা বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তরুণী।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ইফতেখার হোসেনের বাবা তরুণীকে ফোন করেন। ওই সময় তাঁর পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় ইফতেখার হোসেন তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন, মানসিকভাবে নির্যাতন করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

তরুণীর অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১১ সেপ্টেম্বর ইফতেখার হোসেন তাঁর বন্ধু সোহেল এবং পরিচিত একজনকে তরুণীর বাসায় পাঠান। সেখানে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন তিনি। এ সময় ওই পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কল রেকর্ড ও বার্তা মুছে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তরুণী। এসব ঘটনার পর তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বলে জানিয়েছেন।

তরুণীর আশঙ্কা, অভিযুক্ত কর্মকর্তা পুলিশে দায়িত্ব পালন করায় তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করতে পারেন। এমনকি মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ও পাচ্ছেন তিনি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তাঁর মা-বাবার কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাঁকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং বিয়ের সময় কিছু টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

অভিযোগ জমা দেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই তরুণী। তাঁর ভাষ্য, পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর অভিযুক্ত ওসি এবং তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকে হুমকি পাচ্ছেন তিনি ও তাঁর পরিবার। নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে এবং বাসা থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।

এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগকারী যদি প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসীন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তাহলে তাঁর বক্তব্য নির্ভয়ে তুলে ধরার পরিবেশ তৈরি করা এবং সম্ভাব্য হুমকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য শোনাও জরুরি। বিশেষ করে অভিযোগে কল রেকর্ড, মোবাইল ফোনের বার্তা এবং সেগুলো মুছে ফেলার প্রসঙ্গ থাকায় এসব বিষয়ে প্রযুক্তিগত ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কোনাবাড়ী থানার ওসি মো. ইফতেখার হোসেনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন। অর্থাৎ, অভিযোগকারী তরুণীর বক্তব্যের বিপরীতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন। ফলে তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের বিভিন্ন দিক যাচাই করা ছাড়া ঘটনাটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. তাহেরুল হক চৌহান জানিয়েছেন, তাঁরা এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিলে তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

তবে অভিযোগ জমা দেওয়ার প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হওয়ায় অভিযোগকারী তরুণীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁকে যথাযথভাবে অবহিত করা এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে কি না, সেটিও দায়িত্বশীলভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ বা সম্পর্কের অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ আইনগত সহায়তা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর বক্তব্য যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি অভিযুক্ত কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে থাকা তথ্য, সম্ভাব্য সাক্ষ্য, যোগাযোগের রেকর্ড এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি যাচাই করে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা জরুরি। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত না হলে সেটিও যথাযথভাবে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, কোনাবাড়ী থানার ওসির বিরুদ্ধে তরুণীর আনা অভিযোগ এখন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তদন্তের অপেক্ষায়। অভিযোগকারী যেখানে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার চাইছেন, সেখানে অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত যেন প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী হয় এবং অভিযোগকারী কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা হয়রানির শিকার না হন—এটাই সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে প্রত্যাশিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com