প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক চেতনা ধারণ করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান। তিনি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো বিদেশি শক্তির আধিপত্য মেনে নেওয়া যাবে না। দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের অধিকার একান্তভাবেই বাংলাদেশের জনগণের। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন রাশেদ প্রধান। এ সময় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে অংশ নেওয়া তৎকালীন সেনাসদস্য এবং দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং দেশের ওপর বিদেশি প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
রাশেদ প্রধান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সৈনিক ও মুক্তিকামী জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ওই দিন সাধারণ মানুষ ও সেনাসদস্যদের সম্মিলিত ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি বলেন, সেদিনের আন্দোলন ও জনতার স্লোগানের মধ্য দিয়ে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে চেতনা প্রকাশ পেয়েছিল, তা এখনো প্রাসঙ্গিক।
বিবৃতিতে তিনি ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক স্লোগান হিসেবে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ এবং ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ, নিপাত যাক’ উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই স্লোগানগুলো ছিল স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্র পরিচালনার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। বর্তমান প্রজন্মকেও সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক ঘটনাবলি তুলে ধরে রাশেদ প্রধান বলেন, ৩ নভেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দি করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও ভারতের সমর্থনে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ওই সময় যে পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সেনাসদস্য ও সাধারণ মানুষ তা প্রতিহত করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
তবে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ঘটনাবলি বাংলাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়। ওই সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। ৩ নভেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এসব ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ইতিহাস বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। রাশেদ প্রধান তাঁর দলীয় ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনাগুলোর মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।
বিবৃতিতে পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়েও সমালোচনা করেন জাগপা মুখপাত্র। তিনি অভিযোগ করেন, পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করেছে এবং ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে। তাঁর ভাষায়, দেশের জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে বিদেশি শক্তির প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাশেদ প্রধানের এসব অভিযোগ দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে প্রাণহানি, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্যিক ভারসাম্য এবং পারস্পরিক স্বার্থের প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ, সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখাও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণ এবং কূটনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিবৃতিতে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রাশেদ প্রধান। তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান দেশের মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রত্যাশা থেকে মানুষ নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। তবে এই পরিবর্তনের পরও দেশের বিরুদ্ধে বহুমুখী ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তাঁর অভিযোগ, আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগীরা নতুনভাবে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনো তৎপরতা মোকাবিলায় রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিভেদ ভুলে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
রাশেদ প্রধান আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক শিক্ষা ধারণ করে ভবিষ্যতের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। দেশের লাল-সবুজ পতাকা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আবারও আঘাত এলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যকে বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রধান শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিবেচনায়, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক চর্চা, রাজনৈতিক সংস্কার এবং পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা, জাতীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল বক্তব্য ও গঠনমূলক আলোচনা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার ভৌগোলিক সীমানা বা সামরিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণের ঐক্য, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই বিদেশি প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাশেদ প্রধানের এই বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় সামনে এসেছে—১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক স্মৃতি, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন। তাঁর আহ্বানের মধ্য দিয়ে জাগপা দেশের রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা দিয়েছে। এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে এই আহ্বান কীভাবে আলোচনার জন্ম দেয় এবং দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দলগুলো কী ধরনের অবস্থান গ্রহণ করে, সেটিই দেখার বিষয়।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত