প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগর পর্যায়ের সাংগঠনিক নেতৃত্বে নতুন মেয়াদের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও অধিকাংশ শাখায় আগের নেতৃত্বই বহাল রয়েছে। ঘোষিত ৭৭টি সাংগঠনিক শাখার মধ্যে ৫১টিতে আগের আমিররা আবার নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও মহানগর শাখায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা নেতাদের জায়গায় নতুন মুখ এসেছে। দলটির নেতৃত্ব নির্বাচন ঘিরে একদিকে অভিজ্ঞ নেতাদের ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে নেতৃত্বে পরিবর্তনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দলটির পক্ষ থেকে গত বুধবার রাতে ২০২৭-২৮ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত জেলা ও মহানগর আমিরদের নাম ঘোষণা করা হয়। রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে নির্বাচিতদের নাম প্রকাশ করেন দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। দলীয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সংগঠনের রুকনদের গোপন ভোটের মাধ্যমে জেলা ও মহানগর আমির নির্বাচন করা হয়েছে।
তবে ঘোষিত ৭৭টি শাখার মধ্যে ৫১টিতে আগের আমিররা পুনর্নির্বাচিত হলেও নেতৃত্বে পরিবর্তনের চিত্রও রয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি জেলায় দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের পর নতুন নেতৃত্ব এসেছে। খাগড়াছড়িতে প্রায় ২৮ বছর দায়িত্ব পালন করা সৈয়দ মো. আবদুল মোমেনের পরিবর্তে নতুন আমির হয়েছেন মিনহাজুর রহমান। তিনি আগে জেলা শাখার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দলীয় তথ্য ও সংগৃহীত বিভিন্ন জেলার নেতৃত্বের বিবরণ অনুযায়ী, অন্তত ১০টি জেলায় আমিররা এক দশক বা তার বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন মেয়াদেও তাঁদের কয়েকজন আবার নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ঝালকাঠির হাফিজুর রহমান সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনের উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছেন। তিনি ২০০৪ সাল থেকে টানা ২২ বছর জেলা আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন মেয়াদেও তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
এ ছাড়া রাঙামাটির মোহাম্মদ আবদুল আলীম এবং বান্দরবানের এস এম আবদুছ ছালাম আজাদ ১৬ বছর ধরে দায়িত্ব পালনের পর আবারও নির্বাচিত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জের মো. শাহিনুর আলম ১৪ বছর একই পদে থাকার পর নতুন মেয়াদেও দায়িত্ব পেয়েছেন। বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, মেহেরপুর ও টাঙ্গাইলসহ আরও কয়েকটি জেলায় দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব অব্যাহত রয়েছে।
শুধু জেলা পর্যায়েই নয়, কয়েকটি মহানগর শাখাতেও দীর্ঘদিন ধরে একই নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। নাটোর, বরিশাল মহানগর, বরগুনা, নড়াইল, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং মানিকগঞ্জের আমিররা পঞ্চম মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন বলে সংগৃহীত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন মেয়াদের নির্বাচনেও অভিজ্ঞ ও পরিচিত নেতৃত্বের ওপর দলীয় সদস্যদের আস্থার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পরিবর্তন এসেছে। খাগড়াছড়ির বাইরে জয়পুরহাট, খুলনা, বরিশাল, রাজবাড়ী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় নতুন আমির নির্বাচিত হয়েছেন। জয়পুরহাটে গোলাম কিবরিয়া, খুলনায় কবিরুল ইসলাম, বরিশালে মাহফুজুর রহমান, রাজবাড়ীতে হাসমত আলী এবং লক্ষ্মীপুরে এ আর হাফিজুল্লাহ নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন।
লক্ষ্মীপুরের নতুন আমির এ আর হাফিজুল্লাহ এর আগে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে দলটির প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁর একটি মন্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। নতুন দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এলেন।
মহানগর পর্যায়েও কয়েকটি শাখায় নতুন নেতৃত্ব এসেছে। বগুড়ায় আবদুল মালেক, রাজশাহীতে মো. জাহাঙ্গীর, ময়মনসিংহে আসাদুজ্জামান সোহেল এবং গাজীপুরে খায়রুল হাসান নতুন আমির হয়েছেন। জেলা পর্যায়ে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, মাগুরা, পিরোজপুর, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, ফরিদপুর ও সুনামগঞ্জেও নতুন আমির নির্বাচিত হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জে মাসুদুর রহমান চলতি বছরের শুরুতে ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এবার তিনি নির্বাচিত আমির হয়েছেন। অন্যদিকে কুড়িগ্রামের মো. আজিজুর রহমানের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাও উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর জেলা আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে আবার দায়িত্ব পাওয়ার পর নতুন নির্বাচনেও রুকনরা তাঁকে আমির নির্বাচিত করেছেন।
তবে সব শাখায় নতুন মেয়াদের নেতৃত্ব ঘোষণা করা হয়নি। কুমিল্লা মহানগর ও জামালপুর জেলা শাখার আমিরের নাম বুধবারের ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা মহানগর শাখার কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে গত ১৪ অক্টোবর দলীয় কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এর দুই দিন পর মহানগর কমিটি ভেঙে দেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিনের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ কারণে সেখানে নতুন কমিটির জন্য ভোট গ্রহণ হয়নি।
অন্যদিকে জামালপুর জেলা শাখায় ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হলেও কিছু বিষয় পর্যালোচনার জন্য ফল প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে ওই শাখার নতুন আমির কে হচ্ছেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। এ দুই শাখার নেতৃত্ব ঘোষণা না হওয়ায় দলটির সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে আরও সময় লাগতে পারে।
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা ও মহানগর আমিরের মেয়াদ দুই বছর। দলের রুকনরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাঁদের নির্বাচন করেন। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এবার ৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মা’ছুমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন এ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। প্রতিটি শাখার জন্য আলাদা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট শাখায় রুকন সম্মেলনের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ শেষে নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা করা হয়।
একই ব্যক্তি বারবার আমির নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গঠনতন্ত্র অনুসারে রুকনরাই দায়িত্বশীল নির্বাচনে ভোট দেন। তিনি বলেন, ইসলামি সংগঠন হিসেবে জামায়াতের নেতৃত্বের কিছু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। এক বা দুই বছর দায়িত্ব পালন করে অনেকে সংগঠনের কার্যক্রম পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন না। এ কারণে কেউ কেউ একাধিকবার নির্বাচিত হন। তাঁর ভাষ্য, নেতাদের দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পেছনে রুকনদের ভোটই মূল বিষয়।
দলটির নেতৃত্ব নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তির দায়িত্বে থাকা এবং নতুন নেতৃত্বের সুযোগ তৈরির বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় এসেছে। একদিকে অভিজ্ঞ নেতাদের মাধ্যমে সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার যুক্তি রয়েছে, অন্যদিকে নেতৃত্বে নতুনদের অংশগ্রহণ সংগঠনের কর্মপরিধি ও সাংগঠনিক গতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোন শাখায় কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্তে দলটির গঠনতন্ত্র ও রুকনদের ভোটই নির্ধারক হিসেবে কাজ করছে বলে দলীয় বক্তব্যে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ২০২৭-২৮ মেয়াদের জেলা ও মহানগর নেতৃত্ব নির্বাচনে পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ শাখায় আগের আমিরদের পুনর্নির্বাচিত হওয়া সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে কয়েকটি জেলায় দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের পরিবর্তন দলটির অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের দিকটিও সামনে এনেছে। কুমিল্লা মহানগর ও জামালপুরের ফল ঘোষণা বাকি থাকায় নেতৃত্ব নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত