ট্রফি জয়ের পরও ট্রফি হাতে না ওঠায় বিতর্কে ভারত-পাকিস্তান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
ট্রফি জয়ের পরও ট্রফি হাতে না ওঠায় বিতর্কে ভারত-পাকিস্তান

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

এশিয়া কাপের ১৭তম আসরের ফাইনাল ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। কিন্তু মাঠে পাওয়া সেই সাফল্যের আনন্দকে ছাপিয়ে গেছে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চের বিতর্ক। ক্রিকেটপ্রেমীরা প্রত্যাশা করেছিলেন ভারতীয় দল ফাইনালে পাকিস্তানকে ৫ উইকেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর হাতে উঠবে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি, কিন্তু ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি)-এর সভাপতি ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির কাছ থেকে ট্রফি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় ভারতীয় ক্রিকেট দল। পরবর্তীতে ট্রফি হস্তান্তরের পরিবর্তে নাকভি সেটি সঙ্গে করেই নিয়ে চলে যান, আর এই ঘটনাই বিশ্ব ক্রিকেটে আলোচনার ঝড় তোলে।

রোববার রাতে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এই ফাইনাল ঘিরে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ সব সময়ই ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণ। ম্যাচে ভারতীয় দল অসাধারণ দক্ষতায় পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা জয় নিশ্চিত করে। কিন্তু খেলার পরপরই যে নাটকীয়তা তৈরি হলো, সেটি বহু বছর ক্রিকেট ইতিহাসে মনে রাখার মতো এক অনভিপ্রেত অধ্যায় হয়ে থাকবে।

খেলা শেষ হওয়ার পরপরই মঞ্চ প্রস্তুত করা হয় পুরস্কার বিতরণের জন্য। কিন্তু সেখানে প্রথমদিকে দেখা মেলেনি পাকিস্তান দলের খেলোয়াড়দের। প্রায় ৪৫ মিনিট বিলম্বে তারা উপস্থিত হন। ভারতীয় ক্রিকেটাররা এই সময় পুরোটা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত পুরস্কার বিতরণ শুরু হলে ভারতীয় ক্রিকেটার তিলক ভার্মা, কুলদিপ যাদব ও অভিষেক শর্মা তাঁদের পুরস্কার গ্রহণ করেন। রানার্স-আপ পাকিস্তান দলকেও প্রদান করা হয় মেডেল ও আর্থিক পুরস্কারের প্রতীকী চেক।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসে চিত্র বদলে যায়। ভারতীয় দল ট্রফি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এ সময় সঞ্চালক সাইমন ডুল ঘোষণা করেন, ভারত ট্রফি নেবে না। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, মহসিন নাকভি শুধু এসিসি সভাপতি ও পিসিবি চেয়ারম্যানই নন, তিনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। তাই রাজনৈতিক কারণে ভারতীয় দল তাঁর হাত থেকে ট্রফি নিতে রাজি হয়নি। ঘটনাস্থলেই মঞ্চ ছেড়ে চলে যান নাকভি, সঙ্গে নিয়ে যান ট্রফিও।

এরপর থেকেই বিতর্ক চরমে পৌঁছায়। ট্রফি না পাওয়ার হতাশা লুকোতে পারেননি ভারতীয় ক্রিকেটাররা। তারা মঞ্চ ছাড়লেও ড্রেসিং রুমে নিজেদের মতো করেই ‘অদৃশ্য ট্রফি’ নিয়ে উদযাপন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই দৃশ্য ভাইরাল হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সেক্রেটারি দেবজিত সাইকিয়া সাংবাদিকদের জানান, এসিসি সভাপতির হাত থেকে ট্রফি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বোর্ডের সচেতন পদক্ষেপ। তবে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এর মানে এই নয় যে এসিসি সভাপতি ট্রফি নিজের কাছে রেখে দেবেন। তিনি প্রত্যাশা করেন, খুব দ্রুতই ট্রফি ও পদক ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, নভেম্বরে দুবাইয়ে আইসিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা রয়েছে। সেখানে এসিসি সভাপতির বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ জানানো হবে এবং আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও তোলা হবে।

ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবও তাঁর অসন্তোষ লুকোননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমি ক্রিকেট খেলা শুরুর পর থেকে এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি যে, কোনো চ্যাম্পিয়ন দল ট্রফি পাচ্ছে না। এটা এমন একটি শিরোপা যা আমরা ভীষণ কষ্ট করে জিতেছি। তাই এটা আমাদের প্রাপ্য ছিল।” তবে তিনি আরও যোগ করেন, ট্রফি না পেলেও দলের খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফই তাঁর কাছে আসল ‘ট্রফি’, কারণ তাঁদের নিরলস পরিশ্রমের কারণেই দলটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

এশিয়া কাপ ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক টানাপোড়েন বহুবার প্রভাব ফেলেছে দুই দেশের ক্রিকেটে। এর আগে গ্রুপ পর্ব ও সুপার ফোর ম্যাচে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ভারতীয় খেলোয়াড়রা। সেটি নিয়েই যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছিল। ফাইনালের মঞ্চে এসে সেই উত্তেজনা আরও এক ধাপ উপরে উঠে গেল।

ক্রিকেটবিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বকেই নয়, বরং এসিসির নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেখানে খেলাকে সবসময় কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা হয়, সেখানে ট্রফি বিতরণের মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনে এমন দৃশ্য পুরো এশীয় ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে ধাক্কা দিয়েছে।

এশিয়া কাপের ১৭তম আসর শেষ হলেও এই ট্রফি বিতরণী বিতর্কের রেশ দীর্ঘস্থায়ী হবে বলেই মনে করছেন অনেকে। ভারতীয় বোর্ডের অবস্থান স্পষ্ট, তারা রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে কোনো সম্মাননা নিতে রাজি নয়। অন্যদিকে পাকিস্তানি পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না এলেও মহসিন নাকভির আচরণ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, মাঠের ক্রিকেটে ভারত শিরোপা জিতলেও মাঠের বাইরে এই বিতর্ক যেন জয়ী হয়েছে। একদিকে যেখানে ভারতীয় ক্রিকেটাররা নিজেদের সক্ষমতা ও সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে, সেখানে প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এশিয়া কাপের রঙ নষ্ট করেছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রফি ফেরত দেওয়ার বিষয়ে এসিসি ও পিসিবির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয় এবং আইসিসির সভায় ভারতীয় বোর্ডের প্রতিবাদের ফল কতদূর গড়ায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত