প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে রাশিয়া থেকে আমদানি করা ৫২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন গম নিয়ে বিশালাকার জাহাজ ‘এমভি পার্থি’ চট্টগ্রামের কুতুবদিয়া বর্হিনোঙ্গরে নোঙর করেছে। সোমবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, গত ৭ জুলাই স্বাক্ষরিত নগদ ক্রয় চুক্তির আওতায় এ চালানটি এসেছে, যা দেশের খাদ্য মজুদে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, জাহাজে থাকা গমের নমুনা পরীক্ষা ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং তা মানসম্মত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দ্রুত পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ৩১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন এবং মোংলা বন্দরে অবশিষ্ট ২১ হাজার মেট্রিক টন গম খালাসের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এভাবে দেশের দুইটি প্রধান সমুদ্রবন্দরে ভাগ করে পণ্য খালাসের মাধ্যমে সময় ও খরচ সাশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাকে দ্রুত ও কার্যকর রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশে গম একটি কৌশলগত খাদ্যশস্য হিসেবে গুরুত্ব বহন করে। চালের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত শস্য হিসেবে দেশের খাদ্য বাজারে গমের স্থিতিশীল সরবরাহ প্রয়োজন। বিশেষ করে রুটি, বিস্কুট, নুডলস, পাউরুটি এবং বিভিন্ন ধরনের বেকারি পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে এর চাহিদা সর্বদা উচ্চ থাকে। কৃষি উৎপাদনে সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশকে প্রতিবছর প্রচুর গম আমদানি করতে হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশীয় উৎপাদন বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ টনের মতো হলেও, মোট চাহিদা প্রায় ৬০ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। সেই ঘাটতি পূরণের জন্য আমদানির উপরই নির্ভর করতে হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে রাশিয়া থেকে এই গম আমদানি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধ ও জলবায়ুগত প্রভাবের কারণে গমের দাম ও সরবরাহ চেইন চাপে পড়েছিল। এর ফলে অনেক দেশেই গমের ঘাটতি দেখা দেয়। বাংলাদেশও এ সংকট থেকে মুক্ত ছিল না। তাই সরকারের সরাসরি উদ্যোগে নগদ চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত গম আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে দেশে খাদ্যশস্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং জনগণকে স্বস্তি দেওয়া যায়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই গমগুলো সরকারি মজুদে সংরক্ষণ করা হবে এবং পরে টিসিবি, সরকারি খাদ্য গুদাম এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে গমের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানোর সুযোগ কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের আমদানি দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় স্বল্পমেয়াদী সমাধান দেয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কৃষিকে আরও আধুনিকায়ন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে মনোযোগী হওয়া জরুরি। দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় গম চাষ হয়েও থাকে, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রণোদনার অভাবে এর উৎপাদনশীলতা এখনো অনেক কম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের উদ্যোগ থাকলে এবং কৃষকদের উপযুক্ত সহায়তা প্রদান করা গেলে আগামী দশকে দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম বন্দরে গম খালাসের পরপরই তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সড়ক ও রেলপথে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে মোংলা বন্দরে খালাসকৃত গম দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এভাবে দুই বন্দরের মাধ্যমে সারা দেশে সরবরাহ কার্যক্রম কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব হবে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গমের এই চালান ছাড়াও আরও কয়েকটি চালান আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। রাশিয়া ছাড়াও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো দেশ থেকেও বাংলাদেশ নিয়মিত গম আমদানি করে থাকে। তবে রাশিয়ার গম তুলনামূলক কম দামে এবং দ্রুত সরবরাহযোগ্য হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে এ উৎসের প্রতি ঝুঁকছে সরকার।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে খাদ্য মজুদ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছিল। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার কারণে কখনো কখনো আমদানির জাহাজ বিলম্বিত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ তৈরি হয়। এর ফলে চাল ও গমের দাম বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়। এবারের চালানটি সময়মতো পৌঁছানোয় সরকার স্বস্তি পেয়েছে এবং জনগণও আশাবাদী যে আসন্ন মৌসুমে খাদ্যদ্রব্যের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে।
খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আমদানি নয়, দেশে গম সংরক্ষণ ও মজুদ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে অনেক সরকারি খাদ্য গুদামের অবকাঠামো পুরনো ও অপর্যাপ্ত। নতুন সাইলো নির্মাণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে গমসহ অন্যান্য খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন মান বজায় রেখে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
সার্বিকভাবে রাশিয়া থেকে আসা এই ৫২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন গম বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে সাময়িক স্বস্তি দেবে। তবে এ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানোই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আশাবাদী, সরকারের পরিকল্পিত পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশ আগামী দিনে খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।










