প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলকে ঘিরে বরাবরই থাকে নানা প্রত্যাশা ও চাপ। বিশেষ করে তরুণদের নিয়ে সাজানো নতুন দল যখন মাঠে নামে, তখন ভক্তরা প্রতিটি ম্যাচে খুঁজে ফেরেন সম্ভাবনার আলো। আফগানিস্তানের বিপক্ষে চলমান তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সিরিজের প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ রোমাঞ্চকর জয় পেয়েছে ৪ উইকেটে, যদিও মাঝপথে দলকে পাড়ি দিতে হয়েছে বড় ধসের ভেতর দিয়ে।
১৫১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাওয়ার প্লেতে তানজিদ হাসান তামিম ও পারভেজ হোসেন ইমন ঝড়ো ব্যাটিংয়ে মাত্র ছয় ওভারেই তুলে ফেলেন ১০৯ রান। গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস, টিভির পর্দায় দর্শকদের উল্লাস—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছিল একটি সহজ জয়ের। কিন্তু ক্রিকেটে যে অনিশ্চয়তাই একমাত্র নিশ্চিত, সেটি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আফগানিস্তানের বোলাররা। চোখের পলকে বাংলাদেশের ইনিংসে নেমে আসে ধস। ৯ রানের ব্যবধানে একে একে ছয় ব্যাটসম্যান ফিরে যান ড্রেসিংরুমে। যে ম্যাচ কিছুক্ষণ আগেও বাংলাদেশের পকেটে চলে গেছে বলেই মনে হচ্ছিল, সেটিই মুহূর্তে পরিণত হয় অনিশ্চয়তায় ভরা এক লড়াইয়ে।
তবে দলীয় ব্যাটিং বিপর্যয়কে খুব একটা গুরুত্ব দিতে নারাজ অধিনায়ক জাকের আলী অনিক। ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন, এমনটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হতেই পারে। তার ভাষায়, “আমি ড্রেসিংরুমে আরাম করে বসেছিলাম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এরকম হতেই পারে। আমি ছেলেদের চেষ্টায় সন্তুষ্ট।”
জাকের আরও বলেন, “আমরা রান তাড়ায় দারুণ সূচনা করেছিলাম। এরপর হঠাৎ ধস নামাটা দুশ্চিন্তার, তবে ক্রিকেট তো এমনই এক খেলা যেখানে মুহূর্তেই চিত্র পাল্টে যেতে পারে। প্রতিপক্ষও আমাদের ওপর চাপ তৈরি করেছিল। জেতা-হারাটা খেলারই অংশ। তবে অবশ্যই আমাদের কিছু জায়গায় উন্নতি করতে হবে, বিশেষ করে ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই।”
প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের জয় আসে সপ্তম উইকেটে নুরুল হাসান সোহান ও তরুণ লেগস্পিনার রিশাদ হোসেনের দৃঢ়তায়। তাদের জুটিতে ১৮ বলে আসে ৩৫ রান, যা দলকে এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত জয়। ম্যাচ শেষ হয় ৮ বল হাতে রেখে। এমন চাপের মধ্যেও জয় তুলে নেওয়ায় দলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়েছে বলে মনে করছেন অধিনায়ক। তার কথায়, “আজকের জয় আমাদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। কাল আমরা সিরিজ জয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। দ্বিতীয় ম্যাচেই যদি জয় আসে, তাহলে সেটি দলের জন্য অনেক বড় প্রেরণা হবে।”
এই জয় যেমন বাংলাদেশ দলকে এগিয়ে দিয়েছে, তেমনি আবারও স্পষ্ট করেছে দলের অনিয়মিত ব্যাটিং অর্ডারের দুর্বলতা। পাওয়ার প্লেতে এত বড় সূচনা পাওয়া সত্ত্বেও মাত্র ৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলা বড় ধরনের উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে। কোচিং স্টাফরাও মনে করছেন, খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা ও ম্যাচ সচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ, বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে এমন ব্যাটিং ধসের সুযোগ খুব কমই পাওয়া যায় ঘুরে দাঁড়ানোর।
এখানে আশার আলো জাগিয়েছে নুরুল ও রিশাদের ম্যাচ শেষ করার মানসিকতা। বিশেষ করে তরুণ রিশাদের ব্যাট হাতে দৃঢ়তা অনেককেই অবাক করেছে। তার ওপর স্পিন বিভাগে তার অবদান আগেই প্রমাণিত। এবার ব্যাট হাতেও দায়িত্বশীলতা দেখিয়ে তিনি যেন দলের নতুন ভরসা হয়ে উঠছেন। নুরুল হাসান সোহানের অভিজ্ঞতাও তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আফগানিস্তান দলও লড়াই করেছে সর্বোচ্চ চেষ্টা নিয়ে। তাদের বোলাররা একপর্যায়ে ম্যাচটিকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার ঘাটতি ও চাপ সামলানোর অভাবেই জয় হাতছাড়া হয় তাদের। তবু, এই সিরিজে তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যা দ্বিতীয় ম্যাচে আরও রোমাঞ্চের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ দলের জন্য দ্বিতীয় ম্যাচটি তাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। জাকের আলী অনিকের নেতৃত্বে তরুণদের নিয়ে সাজানো এই দলটি সিরিজ জয় নিশ্চিত করে যদি শেষ ম্যাচকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করতে পারে, তবে তা হবে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর বড় সুযোগ। বিশেষ করে ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতির কথা মাথায় রেখে এই সিরিজে প্রতিটি ম্যাচই দলের জন্য মূল্যবান।
অন্যদিকে, আফগানিস্তানের লক্ষ্য হবে সিরিজে সমতা ফেরানো। তাদের ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই সম্ভাবনা আছে, তবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়ের অভিজ্ঞতা তাদের আছে, সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই তারা মাঠে নামবে।
সব মিলিয়ে, প্রথম ম্যাচের নাটকীয়তা ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে এ সিরিজকে দিয়েছে বাড়তি আকর্ষণ। এখন অপেক্ষা, দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ কি সত্যিই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সিরিজ নিশ্চিত করতে পারে, নাকি আফগানিস্তান লড়াই ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে শেষ ম্যাচকে পরিণত করে সিরিজের ফাইনালে।
বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকরা অবশ্য আশাবাদী, জাকের আলী অনিকের নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের এই দল আরও পরিণত হবে এবং ক্রিকেটের অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই জয় ছিনিয়ে আনতে শিখবে। প্রথম ম্যাচের রোমাঞ্চ তাই কেবল শুরু, প্রকৃত রূপ দেখা যাবে পুরো সিরিজ শেষে।