ইংল্যান্ডের সাথে হারলো বাংলাদেশ বিতর্কে আম্পায়ার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৬ বার
আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ম্যাচ হাতছাড়া বাংলাদেশ দলের

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের ইংল্যান্ড সফরের সর্বশেষ ম্যাচটি যেমন উত্তেজনাপূর্ণ ছিল, তেমনি তৈরি করেছে নতুন বিতর্কের জন্ম। ভারতের পুনেতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে বাংলাদেশের মেয়েরা যখন জয় ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে, তখনই দুটি বিতর্কিত আম্পায়ারিং সিদ্ধান্ত ম্যাচের রূপরেখা বদলে দেয়। ভারতীয় আম্পায়ার গায়াত্রী ভেনুগোপালনের ওই সিদ্ধান্ত দুটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অনেকেই মনে করছেন, সেই সিদ্ধান্তই বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে বঞ্চিত করেছে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল মাত্র ১৭৯ রান। এই রান তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশের স্পিনারদের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে। ৭৮ রানের আগেই ইংল্যান্ড হারায় পাঁচ উইকেট। ম্যাচ তখন একেবারে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। নিগার সুলতানার দল জয়ের গন্ধ পাচ্ছিল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় হিদার নাইটের ব্যাটে, যিনি শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ৭৯ রানে দলকে জয় এনে দেন।

এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল সেই দুটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। ম্যাচের ২৪তম ওভারে নাহিদা আক্তারের একটি বল উঁচু হয়ে স্কয়ার লেগের দিকে যায়। ফিল্ডার সাবিনা নিখুঁতভাবে ক্যাচটি ধরেন এবং মাঠের আম্পায়ার গায়াত্রী ভেনুগোপালন আউট ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা তখন উল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু টিভি আম্পায়ার রিপ্লে দেখার পর বলেন, বলটি ক্যাচের আগে মাটিতে লেগেছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত পাল্টে নাইটকে ‘নট আউট’ ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশি খেলোয়াড়রা সিদ্ধান্তে স্পষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেন। দলনেত্রী নিগার সুলতানা জ্যোতি মাঠে আম্পায়ারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকে। তখন নাইটের রান ছিল ২৩। পরবর্তীতে দেখা যায়, সেই রানই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

এর কিছু সময় পর আসে দ্বিতীয় ধাক্কা। তখন নাইটের রান ৪৮। ফাহিমা খাতুনের একটি বল ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপে যায়, রুমানা আহমেদ সহজ ক্যাচ ধরেন। মাঠের সবাই তখন নিশ্চিত ছিলেন, এটি আউট। কিন্তু আবারও ভেনুগোপালন থার্ড আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত চান। রিপ্লে পর্যালোচনার পর আবারও ‘নট আউট’ ঘোষণা হয়। এ সিদ্ধান্তে মাঠে উপস্থিত দর্শকরাও বিস্মিত হয়।

ম্যাচের পরে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিদার নাইট বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম আমি আউট হয়ে গেছি। আমি প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটছিলাম। কিন্তু টিভি আম্পায়ার সিদ্ধান্ত পাল্টে দেন। হয়তো ভাগ্য আমার পক্ষে ছিল।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের মেয়েরা অসাধারণ বল করেছে। এমন ম্যাচে জয় পাওয়া সবসময় কঠিন, তবে আমরা শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে খেলেছি।”

বাংলাদেশ দলের বোলার ফাহিমা খাতুন বলেন, “সিদ্ধান্তগুলো আমাদের জন্য হতাশার। মাঠের আম্পায়ার আউট দিয়েছেন, কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। দলের সবাই মনে করেছে, এটি পরিষ্কার আউট ছিল। ম্যাচে এমন সিদ্ধান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলে।”

অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি বলেন, “আমাদের মেয়েরা প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু কিছু বিষয় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আমরা খেলায় লড়াই করেছি, সেটাই আমাদের শক্তি। তবুও এমন ম্যাচ হারা কষ্টদায়ক।”

বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার জানান, তারা ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করছেন এবং প্রয়োজনে আইসিসির টেকনিক্যাল কমিটিতে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। টুইটার ও ফেসবুকে #JusticeForBangladesh হ্যাশট্যাগটি ট্রেন্ড করে। ক্রিকেটপ্রেমীরা ভারতীয় আম্পায়ারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অনেকে বলেন, নারী ক্রিকেটেও প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় এমন বিতর্ক তৈরি হয় বারবার।

ভারতের সাবেক ক্রিকেটার সঞ্জয় মাঞ্জরেকার বলেন, “আধুনিক ক্রিকেটে প্রযুক্তির যুগেও যদি এমন বিভ্রান্তি থেকে যায়, তবে তা আম্পায়ারিং ব্যবস্থার ত্রুটিকে স্পষ্ট করে। অন্তত দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ ছিল।” ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক শার্লট এডওয়ার্ডস বলেন, “আম্পায়ারদের ভুল সিদ্ধান্ত খেলার অংশ হলেও এই ধরনের মুহূর্তে তা ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়। বাংলাদেশ অসাধারণ লড়াই করেছে, কিন্তু ভাগ্য তাদের সঙ্গে ছিল না।”

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি, তবে সূত্র বলছে, বোর্ড বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছে। এক কর্মকর্তা বলেন, “বাংলাদেশ নারী দল এখন বিশ্ব ক্রিকেটে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। বারবার এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দলের মনোবলে প্রভাব ফেলে। তাই আমরা বিষয়টি আইসিসির নজরে আনব।”

মাঠের পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে। ১৭৯ রানের ছোট লক্ষ্য নিয়েও ইংল্যান্ডকে চাপে রেখেছিল। ফাহিমা, নাহিদা, রুমানা ও সালমার ধারাবাহিক স্পিন আক্রমণ ইংল্যান্ডকে প্রায় হারিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত হিদার নাইটের দৃঢ়তা এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবিধায়ই ম্যাচ জিতে নেয় ইংল্যান্ড।

বাংলাদেশ নারী দল যদিও জয় পায়নি, তবুও তাদের লড়াইয়ের মনোভাব ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশেষ করে স্পিনারদের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ও দলগত একতা দেখিয়েছে, বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট বিশ্বমঞ্চে ক্রমেই পরিণত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচ আবারও প্রমাণ করেছে নারী ক্রিকেটে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এখনো বহাল। ডিআরএস বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধার যথাযথ ব্যবহার না হলে এমন বিতর্ক থেকে মুক্তি মিলবে না।

বাংলাদেশ দলের এই পরাজয় হতাশাজনক হলেও শিক্ষণীয়ও বটে। কারণ, তারা জানিয়ে দিয়েছে—যদি ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হয়, তবে বিশ্ব ক্রিকেটের যে কোনো দলকেই তারা হারানোর সামর্থ্য রাখে। ক্রিকেট কেবল ব্যাট-বলের খেলা নয়, এটি ন্যায্যতা ও মর্যাদারও লড়াই—এ ম্যাচের পর সেই সত্যটাই আরও একবার প্রমাণিত হলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত