প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও আমদানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো সরকার টু সরকার (G2G) ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি শুরু করেছে সরকার। শনিবার (২৫ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের ওরিগন রাজ্যের পোর্টল্যান্ড বন্দর থেকে যাত্রা করা “এমভি নর্স স্ট্রাইড” নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। জাহাজটিতে রয়েছে ৫৬ হাজার ৯৫৯ মেট্রিক টন গম, যা বাংলাদেশ সরকারের আমদানিকৃত প্রথম চালান হিসেবে দেশে এসেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য অধিদপ্তর ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (USDA) মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানি করা হবে। এরই অংশ হিসেবে এই প্রথম চালান এসে পৌঁছেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। খাদ্য অধিদপ্তর জানায়, জাহাজে থাকা গমের মধ্যে ৩৪ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন চট্টগ্রামে এবং বাকি ২২ হাজার ৭৮৯ মেট্রিক টন মোংলা বন্দরে খালাস করা হবে। ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছানোর পর জাহাজের নমুনা সংগ্রহ ও গুণগত মান পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরীক্ষা শেষে গম দ্রুত খালাসের প্রস্তুতি চলছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, “বিশ্ববাজারে গম সরবরাহে অনিশ্চয়তার সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি আমদানি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।” তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সহযোগিতা দেশের গম মজুত স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “এই চুক্তির আওতায় ধাপে ধাপে আরও বেশ কয়েকটি জাহাজে গম আমদানি হবে। নভেম্বরের মাঝামাঝি দ্বিতীয় চালান আসার কথা রয়েছে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার সকাল থেকে বন্দরে গমের নমুনা পরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। আর্দ্রতা, গ্লুটেন, প্রোটিন ও ওজনের মান যাচাই করা হচ্ছে। পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল পাওয়া গেলে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই খালাস কার্যক্রম শুরু হবে। বন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, “সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে এই সপ্তাহেই বন্দরে গম খালাস শুরু করা সম্ভব হবে।”
বৈশ্বিক বাজারে ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধের কারণে গত দুই বছর ধরে গম সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছিল। এতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সরকার টু সরকার ভিত্তিতে এই গম আমদানির চুক্তি করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি শুধু স্বল্পমেয়াদী চাহিদা পূরণই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের কৃষি-বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জোরদার করবে।
খাদ্য মন্ত্রী (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। এই চালান আমাদের খাদ্য মজুতকে আরও শক্তিশালী করবে এবং বাজারে গম ও আটা সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনবে। এতে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে রুটি, বিস্কুট ও বেকারি শিল্পেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।” তিনি আরও যোগ করেন, “বিশ্ববাজারের ওঠানামার মধ্যেও সরকার যথাসময়ে গম সরবরাহ নিশ্চিত করেছে, যা একটি বড় সাফল্য।”
বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন গমের চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় প্রায় ১২ লাখ টন। ফলে দেশের মোট চাহিদার বড় একটি অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর আগে দেশটি প্রধানত রাশিয়া, ইউক্রেন, ভারত এবং কানাডা থেকে গম আমদানি করত। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই নতুন সহযোগিতা দেশের আমদানি উৎসকে আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “এই প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত বড় পরিমাণ গম সরাসরি বাংলাদেশে এসেছে। এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে খালাস শুরু হয়ে যাবে এবং সড়কপথে গম দেশের বিভিন্ন গুদামে পাঠানো হবে।”
খাদ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের খাদ্য নীতিতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিশ্ববাজারে গমের দাম স্থিতিশীল থাকায় এই সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। তারা আরও মনে করেন, আমদানি উৎস বৈচিত্র্য করার এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
সরকার আশাবাদী যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে এবং শুধুমাত্র গম নয়, অন্যান্য কৃষিপণ্যেও উভয় দেশের মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।