স্বর্ণের বাজারে বড় দরপতন, স্থিতিশীল রুপা 

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
স্বর্ণের দাম আজ বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫।  একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দরপতনের প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। কয়েক দিনের ব্যবধানে ভরিতে ৮ হাজার ৩৮৬ টাকা কমেছে স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) গত ২২ অক্টোবর নতুন এই দর ঘোষণা করে, যা ২৩ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়। ফলে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৮ হাজার ৯৯৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোববার (২৬ অক্টোবর)ও স্বর্ণের এই নতুন দর বহাল রয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই সমন্বয় করা হয়।

নতুন দামে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৮ হাজার ৯৯৬ টাকা, ২১ ক্যারেটের ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫০১ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৭০ হাজার ৯৯৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ২১৯ টাকা।

এর আগে গত ১৯ অক্টোবর বাজুস এক ঘোষণায় ভরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়িয়েছিল স্বর্ণের দাম। তখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ১৭ হাজার ৩৮২ টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ দর হিসেবে রেকর্ড হয়। মাত্র তিন দিন পরই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের বড় পতনের ধাক্কা লেগে সেই রেকর্ডকৃত দাম ভেঙে যায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি, ডলার বাজারের অস্থিরতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নীতির কারণে স্বর্ণের বাজারে ওঠানামা হচ্ছে। ডলারের বিপরীতে অন্যান্য মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছেন। ফলে বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, দেশের স্বর্ণবাজার আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। প্রতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পরিবর্তনের পর স্থানীয়ভাবে সেটির প্রতিফলন ঘটে। তবে দেশের ভোক্তারা যেন হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি বা অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়েও বাজুস নজর রাখছে।

তিনি বলেন, “আমরা নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করি। যখনই দাম বাড়ে বা কমে, আমরা দেশের বাজারে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন দাম নির্ধারণ করি। এতে বাজারে ভারসাম্য বজায় থাকে এবং সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হন না।”

তবে স্বর্ণের দামে এই তারতম্যের মধ্যেও রুপার বাজারে স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাজুসের তথ্যমতে, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ২০৫ টাকায়। ২১ ক্যারেটের রুপা ৫ হাজার ৯১৪ টাকায়, ১৮ ক্যারেটের রুপা ৫ হাজার ৭৪ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮০২ টাকায়।

রুপার দামে কোনো পরিবর্তন না আসায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। অনেকেই এখন অলংকার তৈরিতে স্বর্ণের বদলে রুপাকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। কারণ স্বর্ণের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে বলে মনে করছেন তারা।

হবিগঞ্জের স্থানীয় স্বর্ণকার রাজিব চন্দ্র পাল বলেন, “গত কয়েক মাসে স্বর্ণের দাম এতটা বেড়ে গেছে যে, সাধারণ ক্রেতারা গহনা কিনতে আসলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এখন দাম কিছুটা কমলেও সেটা এখনও অনেক বেশি। এর তুলনায় রুপার চাহিদা বেড়েছে।”

বাংলাদেশের বাজারে স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, বিনিয়োগের অন্যতম একটি ক্ষেত্রও। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে বা শেয়ারবাজার অস্থির থাকলে মানুষ স্বর্ণে বিনিয়োগ করে। কিন্তু দাম অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে সেই বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “স্বর্ণের দাম কমলে সেটি সাধারণ মানুষের জন্য ভালো খবর। এতে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা ফিরে আসে। তবে বাজারে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারেরও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।”

দেশের অর্থনৈতিক প্রবণতা ও বৈশ্বিক বাজারের প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের দামে আগামী দিনগুলোতে আবারও ওঠানামা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারে সুদের হার ও ডলারের মানের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী দামের ধারা।

বর্তমানে দেশের গহনা ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, উৎসব মৌসুম সামনে রেখে স্বর্ণের দাম যদি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে বাজারে বিক্রি কিছুটা বাড়বে। অন্যদিকে বাজুসও জানিয়েছে, ক্রেতাদের স্বার্থ সুরক্ষায় ভবিষ্যতেও বাজার পর্যবেক্ষণ ও দামের যৌক্তিক সমন্বয় অব্যাহত থাকবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম যদি আরও কিছুটা কমে, তাহলে বাংলাদেশের বাজারেও ভরিতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, হঠাৎ করে দাম কমে গেলে কালোবাজারি ও কৃত্রিম সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যা বাজারে নতুন অস্থিরতা আনতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, স্বর্ণের এই দরপতন যেমন ভোক্তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি এনেছে, তেমনি ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। বাজারে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে তাই বাজুস, সরকারের তদারকি সংস্থা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত