প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার রূপনগর এলাকায় পোড়া একটি কারখানা থেকে আরও এক লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার বিকেলে এই লাশ উদ্ধার নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ কমিশনার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান সাংবাদিকদের জানান, লাশটি একদিকে পোড়া এবং অন্যদিকে গলে গেছে। তবে চুল দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একজন নারীর মরদেহ।
মাকছুদের রহমানের তথ্য অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হলো। তিনি বলেন, “একজন নারীর নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে এই লাশ সেই নারী কিনা।” এ ঘটনায় উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শোকাহত পরিবারগুলোর দুঃখও তীব্রভাবে বেড়েছে।
রূপনগর এলাকার এই ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল গত ১৪ অক্টোবর। একটি রাসায়নিকের গুদাম এবং এর পাশের পোশাক কারখানায় আগুন লেগে ঘটনাস্থল মুহূর্তেই ধূ-ধূ করে জ্বলতে থাকে। স্থানীয়রা প্রথমে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশ রাতভর আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। তবে আগুন এত বেশি তীব্র ছিল যে, কারখানার দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ঢোকার কাজ অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। সেই দিনই ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
রূপনগর থানার ওসি মোরশেদ আলম জানান, নিহতদের মধ্যে ১০ জনকে স্বজনরা প্রত্যক্ষভাবে শনাক্ত করেছেন। তারপরও সবার ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছে। ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ১৬ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিটি পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তরের সময় তাদের চোখে অশ্রু দেখা গেছে। এই ট্র্যাজেডি পুরো এলাকার মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।”
প্রাথমিক শনাক্তকৃতদের মধ্যে আছে আব্দুল আলিম (১৪), আসমা আক্তার (১৩), মুক্তা বেগম (৩০), তোফায়েল আহমেদ (২২), নাজমুল ইসলাম (৪০), নার্গিস আক্তার (১৮), জয় মিয়া (২০), মোনা আক্তার সামিয়া (১৪), মাহিরা (১৪), আল মামুন (৩৮), ছানোয়ার হোসেন (২৪), ফারজানা আক্তার (১৫), মৌসুমি খাতুন (২৩), রবিউল ইসলাম (২০), নুর আলম সরকার (২৩) এবং খালিদ হাসান (৩০)।
উপ-কমিশনার মাকছুদের রহমান জানান, “পরিস্থিতির কারণে আগুনের শুরুর দিন কারখানার কিছু অংশে ঢোকা সম্ভব হয়নি। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব হয়। সর্বশেষ মরদেহটি সেই অংশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যেখান থেকে আগে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের ঘটনা একটি বড় শিক্ষণীয় বার্তা দেয়। শিল্প নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।”
স্থানীয়রা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় এমন দৃশ্য দেখে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। অনেকেই মনে করেন, যদি আগুনের শুরুর মুহূর্তে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হত, হয়তো এই মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেত। তবে সর্তকতা ও নিরাপত্তার অভাব এবং জরুরি পদক্ষেপের দেরি এই বিশাল বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া লাশগুলো অতি দগ্ধ অবস্থায় ছিল। কিছু লাশ এতটাই পোড়া যে তাদের বয়স বা পরিচয় শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই কারণে ডিএনএ পরীক্ষার গুরুত্ব অত্যন্ত বেড়ে যায়। প্রত্যেক পরিবারকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে স্বজন শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
সিভিল সোসাইটির অভিজ্ঞরা বলছেন, শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তার অভাব এবং অগ্নি-নিরাপত্তা নির্দেশিকার যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমন ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে পুরনো কারখানা বা রাসায়নিক সংরক্ষণের স্থানগুলোতে নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, আগুন নেভানোর সরঞ্জাম, এবং জরুরি পদক্ষেপের পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। রূপনগরের এই ঘটনায় পুরো শহর এই বিষয়টি উপলব্ধি করেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে দেখা গেছে, পরিবারগুলো শোকাহত ও হতবাক। অনেকেই বলেন, ‘‘আমাদের সন্তানরা শুধু কাজ করতে গিয়েছিল, কিন্তু এখন আর তারা আমাদের সঙ্গে নেই।’’ আরেক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, ‘‘প্রতিটি লাশের সঙ্গে একটি পরিবার নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাদের ক্ষত কেউ পূরণ করতে পারবে না।’’
উপ-কমিশনার মাকছুদের রহমান নিশ্চিত করেছেন, তদন্ত এখনও চলছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তা চূড়ান্তভাবে কেমন ছিল, কারা দায়ী, এগুলো নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাই, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন না ঘটে। তাই আমাদের তদন্ত সম্পূর্ণ ও স্বচ্ছ হবে।’’
অবশেষে, এই অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি শিল্প দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের সমাজে শিল্প নিরাপত্তা, শ্রমিকদের অধিকার, এবং প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রতি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। রূপনগরের পোড়া কারখানার এই ভয়ঙ্কর স্মৃতি ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে। নিহত পরিবারগুলো এই শোক সহ্য করতে পারেনি, তবে তাদের কষ্ট ও ন্যায়ের দাবিকে সম্মান জানিয়ে প্রশাসন ও সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে।