প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ রবিবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের স্বার্থে নির্মিত খাদ্য গোদামগুলো আজ রীতিমতো পরিত্যক্ত। যে ভবনগুলো একসময় কৃষকদের আনাগোনা, ধান সংগ্রহ কার্যক্রম ও কর্মকর্তাদের ব্যস্ততায় সরগরম থাকত, সেগুলো এখন পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের আড্ডা, জুয়ার আসর আর অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে। কোথাও কোথাও এসব ভবনের জায়গা দখল করে বসবাস করছে কিছু পরিবার—যা সরকারি সম্পদের চরম অপব্যবহার এবং কৃষকদের জন্য বড় ধরনের বঞ্চনা।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে এবং পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে তাহিরপুর, ধর্মপাশা, শাল্লাসহ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে কৃষকদের সুবিধার্থে খাদ্য গোদাম ও অফিসকক্ষ নির্মাণ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল—উৎপাদিত ধান স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে কৃষকদের সময়, খরচ ও ভোগান্তি কমানো। কিন্তু নানা জটিলতা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে কয়েক বছর চলার পরই এগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গত তিন যুগ ধরে এসব ভবন দাঁড়িয়ে আছে অবহেলায়—পলেস্তরা খসে পড়ছে, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে, আর আশপাশে পরিবেশ হয়ে উঠছে বিপজ্জনক।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় ৫৯টি গোদাম রয়েছে, মোট জায়গা ৭.৩৫৫ একর। বিভিন্ন উপজেলায় এগুলোর অবস্থান এমন—সুনামগঞ্জ সদর ৬টি, বিশ্বম্ভরপুরে ২টি, দিরাইয়ে ৫টি, ধর্মপাশায় ৫টি, শান্তিগঞ্জে ৭টি, জামালগঞ্জে ৫টি, তাহিরপুরে ৪টি, দোয়ারাবাজারে ৫টি, ছাতকে ৮টি, শাল্লায় ৪টি এবং জগন্নাথপুরে ৮টি। এসব গোদামের অধিকাংশই বর্তমানে দখল, দুষণ ও অযত্নে পড়ে আছে।
সচেতন মহল ও স্থানীয় কৃষকদের দাবী—যদি এসব ভবন সংস্কার করে ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান সংগ্রহ পুনরায় চালু করা যায়, তাহলে কৃষকদের আর উপজেলা সদরে যেতে হতো না। এতে সময় ও পরিবহন খরচ দুই-ই কমত এবং তাদের আর্থিক সাশ্রয় হতো।
ধর্মপাশার জয়শ্রী এলাকার কৃষক আলী নেয়াজ জানান, পরিত্যক্ত গোদামটি এখন মাদকাসক্তদের নিরাপদ আড্ডায় পরিণত হয়েছে। রাতদিন মাদক সেবন, জুয়া ও অসামাজিক কার্যকলাপে এলাকা নোংরা হয়ে যাচ্ছে। তাহিরপুরের বাদাঘাট ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মোতালেব বলেন, “এরশাদের আমলে আমরা এখানে ধান রাখতে পারতাম, পরে বন্ধ হয়ে যায়। এখন ভবন আছে, কিন্তু কাজ নেই। চালু হলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো।”
বিশ্বম্ভরপুরের কৃষক জামিল মিয়া মনে করেন, উপজেলা সদরের দূরত্বের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, তাই ইউনিয়ন-স্তরে ধান সংগ্রহ ব্যবস্থা পুনরায় চালু হওয়া প্রয়োজন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “কৃষকদের স্বার্থে নির্মিত এসব গোদাম এখন ব্যবহারের অযোগ্য এবং অধিকাংশই দখলে। উচ্চস্তরের কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এগুলো চালু করতে হলে আগে দখলমুক্ত করতে হবে, তারপর মেরামত করতে হবে। পুনরায় চালু করা গেলে কৃষকেরা উপকার পাবেন।”
একদা কৃষকের স্বপ্ন পূরণে নির্মিত এসব খাদ্য গোদাম এখন পরিণত হয়েছে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার প্রতীকে। প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ—নইলে সরকারি টাকায় নির্মিত এই সম্পদ একসময় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে, আর কৃষকেরা হারাবেন তাদের প্রাপ্য সুবিধা।