রাজধানীসহ নারীরা-শিশুরা ভূমিকম্পের ট্রমায় ভুগছে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১০৪ বার
ভূমিকম্পে সচেতনতা জরুরি: করণীয় ও বর্জনীয় নির্দেশনা

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সম্প্রতি দুদিনে মাত্র ৩১ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরপর চারটি ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনি রাজধানীসহ সারা দেশে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গত শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায় রাজধানীর বিভিন্ন বহুতল ভবনে এবং শহরের ঘরবাড়িতে স্থায়ীভাবে প্রতিধ্বনিত শক্তিশালী ভূমিকম্পের ২০ সেকেন্ড দীর্ঘ ঝাঁকুনি নারী ও শিশুদের মধ্যে গভীর মানসিক ক্ষত ও ট্রমার সৃষ্টি করেছে। ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিজেই ভয়ঙ্কর, কিন্তু তার প্রভাবে সামাজিক ও মানসিক স্তরে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে তা এখনো অনেকের জন্য সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি পরিলক্ষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহল্লা, স্কুল-কলেজ ও অফিসের নারী-শিশুরা আতঙ্কে পড়েছেন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে রাতের অচেতন সময়ে হঠাৎ চিৎকার করা, ঘুম ভেঙে ওঠা, উদ্বেগ বা ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখা ইত্যাদি ঘটনার খবর মিলছে। রাজধানীর বাইরের জেলা ও গ্রামাঞ্চলের নারী-শিশুরাও একইভাবে মানসিক চাপ ও ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে একা ঘুমাতে পারছেন না; ঘরের দেয়াল, জানালা বা নড়াচড়া করা সামান্য বস্তুও ভূমিকম্পের মতো মনে হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আনোয়ার বলেন, “গত শনিবার রাতে আমার তিন বছর বয়সি মেয়ে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে ‘ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!’ বলে চিৎকার করল। তার মাকে দেখেও বোঝা যায়, আতঙ্কের মাত্রা কতটা বেশি। আমাদের পরিবারের সবাই এখন রাতে খুব সতর্ক থাকে, শিশুরা প্রায়ই দৌড়িয়ে আসে।” ঢাকার বেসরকারি চাকরিজীবী তাসফিয়া বলেন, “ভূমিকম্পের পর থেকে অফিসে বোতলের পানি নড়লেও মনে হয় ভূমিকম্প হচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ শুধু আমার নয়, পুরো পরিবারের মধ্যেই বিরাজ করছে। বিশেষ করে শিশুরা ভয়ঙ্করভাবে আতঙ্কিত। দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতি তাদের মানসিক বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ধরনের ভূমিকম্পে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব সাধারণ। শিশুদের জন্য এটি ক্রমশ ভয় এবং উদ্বেগের আকার নেবে, যা ঘুমের ব্যাঘাত, হঠাৎ চিৎকার বা উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে আতঙ্কজনিত মানসিক চাপ শারীরিক সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে, যেমন পেশীতে শক্তি হ্রাস, ঘুমের ব্যাঘাত, হার্ট রেট বেড়ে যাওয়া এবং সাধারণ দুশ্চিন্তা। বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জানান, “ভূমিকম্পের পরপর চারটি ঝাঁকুনি শিশুদের এবং নারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ট্রমার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যারা একা থাকে বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাদের জন্য এটি আরও মারাত্মক।”

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর কাছাকাছি এবং বিশেষত নারায়ণগঞ্জের আশপাশে। ভূমিকম্প বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতার কারণে ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী শহর ও গ্রামেও অনুভূত হয়েছে। রাজধানীর বহু ভবন ও আবাসিক এলাকায় ভূমিকম্পের প্রভাবে ছাদ, দেয়াল ও জানালার নড়াচড়া হওয়ায় নারীদের মানসিক চাপ বেড়েছে। তারা এখন প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং অনিদ্রায় ভোগছেন। বিশেষ করে যেসব শিশু ভূমিকম্পের সময় অভিভাবকের সঙ্গ পায়নি, তারা এখন প্রতি ঝাঁকুনি বা শব্দকে ভূমিকম্প মনে করছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর ও গ্রামে নারী ও শিশুরা রাতের অন্ধকারে আতঙ্কে চিৎকার করছে, ঘর থেকে বের হতে চাচ্ছে, আবার কেউ কেউ ঘরে আটকে থাকায় ভয়ঙ্কর চাপের মধ্যে রয়েছে। অনেকে এই পরিস্থিতিকে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করছে বলেও জানিয়েছেন। তাদের মানসিক সুস্থতা এখন প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা ও মানসিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, এই ধরনের ভূমিকম্পের পর শিশুদের মানসিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকরা তাদের সাথে থাকবেন, তাদের আতঙ্কের বিষয়গুলো শোনাবেন এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবেন। এছাড়া শিশুদের মধ্যে আতঙ্কের প্রাথমিক চিহ্ন দেখা দিলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা আবশ্যক। নারীদের ক্ষেত্রেও পরিবারের সমর্থন, সামাজিক সহায়তা এবং মানসিক পরামর্শ অত্যন্ত প্রয়োজন।

সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিশু বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ভূমিকম্প আতঙ্ক মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষামূলক ও সচেতনতা মূলক কর্মসূচি চালানো প্রয়োজন।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র শারীরিক ক্ষতি নয়, এই ধরনের ভূমিকম্পের প্রভাব মানুষের মন ও আচরণেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের শিক্ষাজীবন, নারীদের সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং পরিবারের সার্বিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই তাদের মানসিক পুনর্বাসন, আতঙ্ক প্রশমনের কার্যকর পদক্ষেপ এবং নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে ভূপ্রকৃতিক দুর্যোগের জন্য জনসচেতনতা, জরুরি ব্যবস্থাপনা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রস্তুতি শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে নারীদের ও শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। শহর ও গ্রামে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র, মানসিক সমর্থন কেন্দ্র এবং জরুরি সেবা সহজলভ্য করা গেলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা হ্রাস পেতে পারে।

মোটের ওপর, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের ঝাঁকুনির পর নারী ও শিশুদের মধ্যে যে মানসিক চাপ, আতঙ্ক ও অনিদ্রার ঘটনা দেখা দিয়েছে তা সামাজিকভাবে উদ্বেগজনক। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু অবকাঠামোগত ক্ষতি নয়, বরং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলেছে। তাই মানবিক ও প্রশাসনিকভাবে তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত