নির্বাচনকে ঘিরে ‘নিরপেক্ষ’ ৬৩৯ ওসির সন্ধানে পুলিশ সদর দপ্তর

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১১৪ বার
নির্বাচনকে ঘিরে ‘নিরপেক্ষ’ ৬৩৯ ওসির সন্ধানে পুলিশ সদর দপ্তর

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশের থানাগুলোতে নতুন করে ওসি নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। উদ্দেশ্য একটাই—একটি সৎ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার নির্বাচন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। এজন্য দেশের আটটি রেঞ্জের ডিআইজিদের কাছে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রশাসনিকভাবে দক্ষ পুলিশ পরিদর্শকদের তালিকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১৬ নভেম্বর অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) একে এম আওলাদ হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমেই শুরু হয়েছে এই প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক যাত্রা।

নির্বাচনের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে থানার ওসিদের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। ভোটকেন্দ্র, প্রার্থীদের চলাচল, নির্বাচনি পরিবেশ, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় থানার ভূমিকা অপরিহার্য। তাই এবারের নির্বাচনে ওসিদের নিয়োগ নিয়ে সদর দপ্তর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সতর্ক ও কঠোর। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি থানায় দায়িত্ব পালনের জন্য এমন কর্মকর্তাদের বেছে নিতে হবে, যাদের সততা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই এবং যারা সঠিকভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, আগের কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের ভোটের অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের “ডামি নির্বাচন”—এই তিনটি নির্বাচনে অনেক থানার ওসিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এবার সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি না ঘটাতে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগের সেই নির্বাচনে যারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাদের কাউকে আসন্ন নির্বাচনে দায়িত্ব দেওয়া হবে না। যাতে কেউ কোনোভাবে লবিং বা প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে দায়িত্ব নিতে না পারেন, তাও নিশ্চিত করছে সদর দপ্তর।

এ ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইজিপি কমপ্লেইন সেলে কোনো অভিযোগ আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, সাময়িক বরখাস্ত বা শাস্তির রেকর্ড রয়েছে—তাদের তালিকায় রাখা হচ্ছে না। একইভাবে নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা যেন নিজ জেলার থানায় নিয়োগ না পান, সে বিষয়টিও কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। কারণ একই জেলায় অবস্থান করলে তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবের সম্ভাবনা থাকে, যা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে।

আরও জানা যায়, ওসিদের অভিজ্ঞতা যাচাইয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে তারা অতীতে কোন সংকটময় সময়ে কোন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। বিভিন্ন রেঞ্জে ওসিদের তালিকাকে এ, বি ও সি—এই তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। যারা এ ক্যাটাগরিতে রয়েছেন, তাদেরও কঠোর যাচাইয়ের মধ্যে রাখা হচ্ছে। কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে তাদের নির্বাচনকালীন দায়িত্ব দেওয়া হবে না।

তবে এই প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মনে করেন পুলিশের কিছু দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। কোনো রেঞ্জে ওসির সঙ্গে ডিআইজির ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলে তার মূল্যায়ন যথাযথ নাও হতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিআইজি তার পছন্দের কর্মকর্তার নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। এসব সম্ভাব্য পক্ষপাতকে সামনে রেখে সদর দপ্তর কনফিডেনশিয়াল শাখাকে গোপনে মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে। তারা সরাসরি থানাগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সদর দপ্তরে রিপোর্ট দেবে, যার ভিত্তিতে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অতীত তিনটি নির্বাচনে পুলিশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে পেতে এবার একটি মডেল নির্বাচন আয়োজন করতে চায় তারা। এজন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কোনো অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না এবং কেউ প্রভাব খাটাতে চাইলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়া শুধু নির্বাচনি পরিবেশ নয়, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলো নিয়েও একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, সারা দেশে ৬৩৯টি থানায় সৎ ও দক্ষ ওসিদের দায়িত্ব দেওয়া হলে নির্বাচনি এলাকায় অন্তত নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও একই—নির্বাচন যেন হয় শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ এবং সবার অংশগ্রহণে। কিন্তু শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে সঠিক বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন চাপ, প্রভাব ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখে কর্মকর্তারা কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে সদর দপ্তরের কঠোর পদক্ষেপ অন্তত ইঙ্গিত দিচ্ছে, এবার তারা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে চান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে এই নির্বাচনকে দেখছেন।

আইজিপি বাহারুল আলম এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি শুধু জানিয়েছেন—নির্বাচন নিয়ে কোনো মন্তব্য তিনি আপাতত করবেন না। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিনি মাঠপর্যায়ে সৎ, নিরপেক্ষ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বাছাইয়ের ব্যাপারে জোর দিচ্ছেন।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন রাজনৈতিক পরিবেশ দিন দিন উত্তপ্ত হচ্ছে, তখন পুলিশ বাহিনীর এই উদ্যোগ একদিকে নির্বাচন কমিশনের কাজকে সহজ করবে, অন্যদিকে ভোটারদের মধ্যে আস্থা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সঠিকতা এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর। নির্বাচন সামনে রেখে এই ৬৩৯ ওসির সঠিক বাছাই—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত