সর্বশেষ :
২০২৬ বিশ্বকাপে বড় পরিবর্তন, ফুটবল টুর্নামেন্টে নতুন যুগের ইঙ্গিত সোমালি রেফারিকে ঢুকতে না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনায় ইয়ান রাইট ২০২৬ বিশ্বকাপ: গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কারা এগিয়ে? মিরসরাইয়ে নিখোঁজ তিন কিশোর উদ্ধার, স্বস্তি ফিরেছে পরিবারে মেলান্দহে পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু চিরিরবন্দরে ৩ মাদকসেবীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারাদণ্ড ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনবে সরকার, বাজার স্থিতিশীলতায় উদ্যোগ প্রশাসনিক কাজে জবাবদিহি নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর মে মাসে বিজিবির অভিযানে ১৭৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ, সীমান্তে কড়াকড়ি জোরদার ৭৯ হাজার ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ নিয়ে নতুন বিতর্ক, যাচাই প্রক্রিয়া ঘিরে আলোচনা

জার্মানিতে হিজাব পরে বিচারক হওয়া নিষিদ্ধ রায়ে বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯৫ বার

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

জার্মানিতে হিজাব পরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করা যাবে কি না, তা নিয়ে বহু বছর ধরে চলমান বিতর্ক আবারও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠেছে হেসে রাজ্যের প্রশাসনিক আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের মাধ্যমে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আদালতের ভেতরে বিচারকাজ চলাকালে কোনো নারী যদি হিজাব খুলতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে তাকে বিচারক বা কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া যাবে না। এই রায় শুধু একটি ব্যক্তিগত আবেদন খারিজ করা নয়, বরং এটি দেশটির বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে আরও বড় প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ঘটনার সূচনা এক নারী আইনি পেশাজীবীর আবেদনকে কেন্দ্র করে। তিনি আদালতের কাছে বিচারক হওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু আবেদন প্রক্রিয়ার সাক্ষাৎকারে তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, বিচারকাজ চলাকালে তিনি আদালতে অবস্থানরত পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলার সময় হিজাব খুলবেন কি না। ওই নারী দ্বিধাহীনভাবে জানান, তিনি হিজাব খুলবেন না এবং এটি তাঁর ধর্মীয় অনুশাসনের অংশ। তার এই অবস্থানের প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে। তিনি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যান। কিন্তু আদালত সেই প্রত্যাখ্যান বহাল রেখে জানায়, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে বিচারকদের ধর্মীয় বা আদর্শিক প্রতীক বহন না করার শর্ত সাংবিধানিকভাবেই যুক্তিযুক্ত।

আদালত তাদের লিখিত বিবৃতিতে স্বীকার করেছে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। তবে আদালত আরও উল্লেখ করে, বিচারব্যবস্থা যেহেতু রাষ্ট্রের ভিত্তি, তাই এর নিরপেক্ষতার ওপর জনসাধারণের আস্থা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত যুক্তি দেয় যে বিচারকের পোশাক বা ব্যক্তিগত উপস্থাপনা বিচারকার্য পরিচালনার সময় এমন কোন বার্তা দিতে পারে না যা রাষ্ট্রের কোনো ধর্মীয় অবস্থান আছে বলে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। ফলে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার স্বার্থে বিচারকদের এমন প্রতীক ধারণ না করার নিয়মটি যৌক্তিক বলে আদালত মত দেয়।

হেসে রাজ্যের এ রায়ের আগেও জার্মানির অন্য অঞ্চলগুলোতে এমন সিদ্ধান্ত দেখা গেছে। গত অক্টোবরে লোয়ার স্যাক্সনির একটি আদালত একজন নারীকে সাধারণ বিচারক হিসেবে কাজ করতে হিজাব পরার অনুমতি না দিয়ে একই ধরনের রায় দেন। দেশটির ব্রাউনশোয়াইগ উচ্চ আঞ্চলিক আদালতও জানিয়েছিল যে, তারা রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার নীতি রক্ষার স্বার্থে বিচারকদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শিক প্রতীক বহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এসব সিদ্ধান্ত জার্মানির বিচারব্যবস্থাকে একক ও統一 নীতি অনুসরণে আরও কঠোর করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

তবে এই রায়গুলো ঘিরে দেশটির বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার নাম করে রাষ্ট্র মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পরিচিতি মুছে ফেলতে বাধ্য করছে। তারা যুক্তি দেন, হিজাব পরা মুসলিম নারীদের জন্য ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অংশ। একটি ধর্মীয় প্রতীক পরার কারণে আদালতের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়—এই ধারণা মূলত বৈষম্যমূলক এবং এক ধরনের স্টেরিওটাইপকে প্রতিষ্ঠা করে।

অনেকেই এটিও বলছেন যে জার্মান সমাজে মুসলিম নারীদের য ohnehin কর্মক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়, তার ওপর বিচারব্যবস্থার মতো পেশায় প্রবেশে এমন নিষেধাজ্ঞা তাদের আরও সীমাবদ্ধ করে ফেলবে। একটি পেশায় অংশ নেওয়ার অধিকার কারও ধর্মীয় পোশাকের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়—এমনটাই মনে করেন অধিকারকর্মীরা। সমালোচকরা আরও বলেন, রাষ্ট্র যেভাবে নিরপেক্ষতার সংজ্ঞা দিচ্ছে, তা নিরপেক্ষ নয় বরং কিছু বিশ্বাসকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং অন্যকে উপেক্ষা করছে।

ধর্মীয় স্বাধীনতার সমর্থকদের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ বাস্তবে শুধুমাত্র মুসলিম নারীদের ওপর প্রভাব ফেলছে, কারণ হিজাবই একমাত্র বহুল ব্যবহৃত ধর্মীয় পোশাক যা আদালতের নিষেধাজ্ঞার আওতায় স্পষ্টভাবে পড়ে। তারা মনে করেন, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করার সামিল এবং জার্মান সংবিধানেও এই ধরনের বাধার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

অপরদিকে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো বলছে, আদালতকে এমন একটি পরিবেশ রাখতে হবে যেখানে বিচারপ্রার্থীরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতে পারেন যে বিচারক ব্যক্তিগত মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত নন। রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা রক্ষা করা শুধু একটি আইনগত বিষয় নয়, বরং এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নিশ্চিত করার মূল ভিত্তি। তাদের মতে, আদালত একটি বিশেষ জায়গা যেখানে সামান্যতম ভ্রান্ত বার্তাও বিচারকার্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতীকবহ পোশাক বা চিহ্ন নিষিদ্ধ করাটাই যৌক্তিক।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, হিজাবকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক জার্মানিতে তীব্র হচ্ছে, তা কেবল একটি ধর্মীয় পোশাকের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ধর্মীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় নীতির সংঘাতের ইঙ্গিত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিজাব বা ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধের মতো ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ফলে এটি আন্তর্জাতিকভাবেও বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

জার্মানিতে বসবাসরত মুসলিম অভিবাসী নারীরা বলছেন, এ ধরনের রায় তাদের সামাজিক অংশগ্রহণ, পেশাগত পথচলা এবং আত্মনির্ভরতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি করছে। অনেকেই মনে করেন, আদালতের রায়গুলো সমাজে মুসলিম নারীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করবে, যা তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, “জার্মানিতে হিজাব পরে বিচারক” নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার মতাদর্শ। আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে জার্মানির বিচারব্যবস্থায় নতুন একটি নজির তৈরি হলেও এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আরও অনেক দিন ধরে আলোচিত থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত