প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ব্যস্ত জীবনযাত্রায় সুস্থ খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে। সময়ের অভাবে গোটা ফল ধুয়ে কেটে খাওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেকেই বিকল্প হিসেবে এক গ্লাস ফলের রস পান করেন। বাইরে বেরোনোর সময় বা অফিসের ফাঁকে এক গ্লাস জুসকে অনেকেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বলে মনে করেন। কিন্তু ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যায় ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস আদৌ নিরাপদ কি না, তা নিয়ে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ফলের রস উপকারী নাকি ক্ষতিকর—এই প্রশ্নটি দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফ্যাটি লিভার বলতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে মূলত লিভারের ভেতরে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়ার অবস্থাকে বোঝানো হয়। এটি অ্যালকোহলজনিত বা নন-অ্যালকোহলিক দুই ধরনেরই হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত শর্করা ও চর্বি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং স্থূলতা এই সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে ফলের রসের ভূমিকা নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গোটা ফল এবং ফলের রস—এই দুটির পুষ্টিগুণ এক নয়। ফল থেকে রস বের করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উপাদানটি বাদ পড়ে যায়, সেটি হলো ফাইবার। ফাইবার শুধু হজমে সহায়ক নয়, এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গোটা ফল খেলে ফাইবার শর্করার শোষণ ধীর করে দেয়, ফলে হঠাৎ করে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। কিন্তু ফলের রস বানানোর সময় এই ফাইবার ছেঁকে ফেলা হয় বা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে রসে থাকে মূলত ভিটামিন, কিছু খনিজ এবং সবচেয়ে বেশি থাকে প্রাকৃতিক শর্করা, বিশেষ করে ফ্রুক্টোজ।
ফ্রুক্টোজ এমন একটি শর্করা, যা শরীরের অন্য কোষের তুলনায় প্রধানত লিভারেই বিপাক হয়। অর্থাৎ ফলের রস পান করার পর এর মধ্যে থাকা ফ্রুক্টোজ সরাসরি লিভারে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত হয়। যখন এই ফ্রুক্টোজের পরিমাণ সীমিত থাকে, তখন লিভার তা সামাল দিতে পারে। কিন্তু নিয়মিত ও অতিরিক্ত পরিমাণে ফলের রস পান করলে লিভারের ওপর চাপ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ লিভারে গিয়ে ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়, যার ফলে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়ে এবং লিভারে চর্বি জমার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গোটা ফলের তুলনায় ফলের রসে ফ্রুক্টোজের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে। একটি আপেল বা কমলা খেলে যে পরিমাণ শর্করা শরীরে যায়, এক গ্লাস আপেল বা কমলার রস পান করলে তার চেয়ে অনেক বেশি শর্করা শরীরে প্রবেশ করে। কারণ রস বানাতে একাধিক ফল একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তা পান করার সময় পেট ভরার অনুভূতি ততটা হয় না। ফলে অজান্তেই শরীর অতিরিক্ত শর্করা গ্রহণ করে ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস বজায় থাকলে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ছাড়াও ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ফ্যাটি লিভারে ফলের রস একেবারেই নিষিদ্ধ—এমনটা নয়। তবে বিষয়টি নির্ভর করে পরিমাণ ও নিয়মিততার ওপর। মাঝে মধ্যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে এক গ্লাস ফলের রস পান করলে সাধারণত তেমন বড় ক্ষতি হয় না। তবে শর্ত হলো, সেই রসে কোনোভাবেই অতিরিক্ত চিনি বা কৃত্রিম মিষ্টিকারক যোগ করা যাবে না। যারা খুব দুর্বল, অসুস্থতা থেকে সেরে উঠছেন বা মাসিকের সময় অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করেন, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সীমিত পরিমাণে ফলের রস উপকারী হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন সকাল বা বিকেলে ফলের রস পান করাকে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে ধরে নেওয়া ফ্যাটি লিভারের রোগীদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়।
গোটা ফল খাওয়ার আরও একটি বড় সুবিধা হলো তৃপ্তি বা পেট ভরার অনুভূতি। একটি আপেল, পেয়ারা বা পেঁপে খেলে পেট অনেকটা ভরে যায়, ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান উপায়। অন্যদিকে ফলের রস পান করলে সেই তৃপ্তি আসে না। বরং কিছুক্ষণ পর আবার ক্ষুধা লাগে এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
পুষ্টিবিদরা আরও বলেন, গোটা ফলে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট লিভারের কোষকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি, ভিটামিন ই এবং বিভিন্ন ফাইটোকেমিক্যাল লিভারের প্রদাহ কমাতে ও কোষের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। ফলের রসে এসব উপাদানের কিছু অংশ থাকলেও ফাইবারের অনুপস্থিতিতে এর উপকারিতা অনেকটাই কমে যায়। তাই ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ফলের রসের চেয়ে গোটা ফল খাওয়াই বেশি কার্যকর বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সব দিক বিবেচনায় বলা যায়, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ফলের রস নিয়মিত পান করা নিরাপদ নয়। এটি লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং রোগের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে পারে। বরং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মৌসুমি গোটা ফল, পর্যাপ্ত শাকসবজি, কম চর্বিযুক্ত প্রোটিন এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম অন্তর্ভুক্ত করাই ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ফলের রস যদি খেতেই হয়, তবে তা যেন খুব সীমিত, মাঝে মধ্যে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হয়—এই সতর্কতাই হতে পারে লিভার সুস্থ রাখার মূল চাবিকাঠি।