ইয়েমেনে বাস–ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ১৬

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৬ বার
ইয়েমেন সড়ক দুর্ঘটনা নিহত

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণাঞ্চলীয় ইয়েমেন আবারও ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো, যেখানে একটি ছোট যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছেন, যা ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। মঙ্গলবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের আল-মাহফাদ জেলার লাহমার এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে রয়টার্স।

স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাটি ঘটে একটি বিপজ্জনক বাঁক ঘোরার সময়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বাঁকটি দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে পরিচিত এবং সেখানে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। সংঘর্ষের পরপরই বাসটির গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুন এত দ্রুত বাসটিকে গ্রাস করে যে ভেতরে থাকা যাত্রীরা বের হওয়ার সুযোগ পাননি। উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বাসটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।

দুর্ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে দূর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার শব্দ ও বিস্ফোরণের আওয়াজ আশপাশের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। অনেকে ছুটে এসে উদ্ধারকাজে সহায়তা করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায়। দগ্ধ বাসের ধ্বংসাবশেষের ভেতর থেকে একে একে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, যাদের বেশিরভাগই গুরুতরভাবে পুড়ে গিয়েছিলেন।

নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ চলছে। অনেকের দেহ এতটাই দগ্ধ যে শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে জরুরি সেবা প্রস্তুত রাখা হলেও কেউ জীবিত উদ্ধার না হওয়ায় চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। দুর্ঘটনার পরপরই ওই এলাকার সড়কটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘদিনের সংঘাতজনিত অবকাঠামো ধ্বংস ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। দেশটির সড়কগুলোতে নিরাপত্তা চিহ্ন, গার্ডরেল, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা কিংবা নিয়মিত সংস্কারের ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই নেই। ফলে পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাঁকযুক্ত পাহাড়ি রাস্তাগুলোতে বড় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারালে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

গত বছর দক্ষিণাঞ্চলের আবিয়ান প্রদেশ-এর একটি দুর্গম পাহাড়ি সড়কে অনুরূপ দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত হন। সেই ঘটনার পর সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি উঠলেও বাস্তবে তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। তারা বলছেন, দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হলে সাময়িক আলোচনা হয়, কিন্তু পরে তা চাপা পড়ে যায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলো আগের মতোই রয়ে যায়।

দেশটির অবকাঠামোগত সংকটের পেছনে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বড় ভূমিকা রাখছে। সরকারি বাহিনী ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলমান সংঘর্ষে দেশের সড়ক নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে অনেক সেতু ও সড়ক ধ্বংস হয়েছে, আবার অনেক রাস্তায় মেরামতের কাজ শুরু হলেও তা শেষ করা যায়নি। তাছাড়া নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা অনেক এলাকায় কাজ করতে পারেন না, ফলে সংস্কার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

মানবাধিকার ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। কারণ সড়ক দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানি ঘটায় না, বরং দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দুর্ঘটনায় কর্মক্ষম মানুষ মারা গেলে পরিবারগুলো অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়।

এই দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেক পরিবার একসঙ্গে একাধিক সদস্য হারিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। একজন স্বজন বলেন, তারা ভেবেছিলেন প্রিয়জনেরা স্বাভাবিক যাত্রা শেষে বাড়ি ফিরবেন, কিন্তু এখন তাদের মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এমন ট্র্যাজেডি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্য গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু তদন্ত নয়, বাস্তবসম্মত অবকাঠামো উন্নয়ন ও কঠোর সড়ক নিরাপত্তা নীতিমালা কার্যকর না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইয়েমেনের চলমান মানবিক সংকটের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা আরেকটি নীরব বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি নিরাপদ যাতায়াতের অভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাই মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন পরিকল্পনায় সড়ক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মত দিয়েছেন।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে নিরাপদ সড়ক শুধু উন্নত দেশের বিলাসিতা নয়, বরং প্রতিটি মানুষের মৌলিক নিরাপত্তার অংশ। নিহতদের স্মরণে স্থানীয়রা প্রার্থনা ও শোকসভা আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের দাবি, নিহতদের আত্মত্যাগ যেন অন্তত ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত