প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ খুরশিদা তার মায়ের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলেন, মনে গর্ব আর প্রত্যাশার অনুভূতি নিয়ে। সেই দিনটি তার জন্য বিশেষ, কারণ এটি তার জীবনের প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার দিন। পথ চলার সময় সে অনুভব করছিল, সে দেশের সমাজের অংশ, গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে পৌঁছার পর খুরশিদার সেই আশা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। তার ভোটকক্ষ তৃতীয় তলায় অবস্থান করছিল এবং হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী খুরশিদার জন্য সিঁড়ি অতিক্রম করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো সহায়তা বা বিকল্প ব্যবস্থা তার জন্য করা হয়নি। বাধ্য হয়ে সে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। সেই অভিজ্ঞতা খুরশিদাকে দেখিয়েছে যে সমানাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র এখনো তার মতো মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়।
খুরশিদার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রতিফলন ঘটায় দেশের বৃহত্তর বাস্তবতার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করেন। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, প্রায় ১৪ লাখ শিশু প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বেড়ে উঠছে। তবে দেশের অবকাঠামো, সামাজিক নীতি এবং ভোটকেন্দ্রের প্রবেশগম্যতা তাদের জন্য এখনও অপর্যাপ্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করেন। জাতিসংঘের ২০২২ সালের তথ্য অনুসারে, এই জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশে বসবাস করছে, যেখানে অবকাঠামো তাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার ২০২০ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী ভোটারদের অংশগ্রহণ সাধারণ ভোটারদের তুলনায় ৫ থেকে ২০ শতাংশ কম।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র স্কুল বা পুরনো সরকারি ভবনে স্থাপন করা হয়, যা প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। সেন্টার ফর ডিসেবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ভবনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে পর্যাপ্ত প্রবেশগম্যতা নেই। ২০১৮ সালের ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে স্থায়ী র্যাম্প নেই। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে এসে দাঁড়ালেও প্রায়ই খুরশিদার মতোভাবে বাধার সম্মুখীন হন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য ব্রেইল বা ট্যাকটাইল ভোটিং সিস্টেমের অভাব রয়েছে, ফলে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন না এবং অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ১০ দশমিক ৪ কোটি ভোটার নিবন্ধিত ছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী ভোটারদের প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট দিতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং প্রায় ২৫ শতাংশ শুধু প্রবেশগম্যতার অভাবে ভোট দিতে পারেননি। এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। যুক্তরাজ্যে ট্যাকটাইল ভোটিং ডিভাইস চালু হয়েছে, যা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দিতে সাহায্য করে। ভারতের নির্বাচন কমিশন হুইলচেয়ার সহায়তা, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক এবং বাড়িতে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা চালু করেছে। এই পদক্ষেপগুলোর ফলে প্রতিবন্ধী ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবন্ধী নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা শুধুমাত্র মানবাধিকারের বিষয় নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটে অন্তর্ভুক্ত না করলে অনেক দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ক্ষতি প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র নৈতিক দিক থেকে নয়, অর্থনৈতিকভাবে ও জরুরি।
বাংলাদেশে এখনো হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষক, উপদেষ্টা, দৃষ্টি-শ্রবণ প্রতিবন্ধী সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা কম দেখা যায়। নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো বা আলোচনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি কম। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং সংবেদনশীল প্রশিক্ষক নেই। এসবের অভাবে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
গণতন্ত্রের যথার্থতা নিহিত থাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনায়। গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়। যখন কোনো নাগরিক শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তার ভোটাধিকারের ব্যবহার করতে পারে না, তখন সেই গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ থাকে। সমাধান অসম্ভব নয়। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে স্থায়ী বা সাময়িক র্যাম্প নির্মাণ, ভোটকক্ষ নিচতলায় স্থাপন, ব্রেইল ব্যালট চালু করা, এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব এবং আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত।
খুরশিদার মতো বহু মানুষ এখনো সেই দিনের অপেক্ষায় রয়েছেন, যেদিন তারা বাধাহীনভাবে ভোট দিতে পারবে। ব্যালট হাতে নেবে, নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে, এবং আঙুলে চিহ্নিত কালির দাগ তাদের অধিকার ও গণতন্ত্রে অন্তর্ভুক্তির প্রতীক হবে।