প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে দেশে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দ্বি-অঙ্কে পৌঁছাতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বড় ধরনের পতনের মুখে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্তরে সরাসরি চাপ তৈরি হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমানভিত্তিক মডেল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান অর্থনৈতিক ভিত্তি বিবেচনায় যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধারাবাহিকভাবে অবমূল্যায়িত হতে থাকে, তবে চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশেরও বেশি হয়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে একটি পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ দশমিক ২৮ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। বর্তমান অবস্থান থেকে রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে ডলার সংকট আরও তীব্র হতে পারে এবং বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জ্বালানি তেলের দাম যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়, তাহলে সরকারকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম সমন্বয় করতে হতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের দামে সরাসরি প্রভাব পড়বে। ফলে খাদ্য ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মূল্য আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ইতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে বাহ্যিক চাপ যুক্ত হলে তা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি করবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের অবমূল্যায়নকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি পরিস্থিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি জ্বালানি তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, তবে মূল্যস্ফীতি আরও দ্রুত বাড়বে এবং রিজার্ভ আরও কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সংকট বা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিতে বেশি পড়ে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করতে হতে পারে, যা রিজার্ভ আরও কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে আশার দিকও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল থাকে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকে, তবে মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। সেক্ষেত্রে অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা। এ তিনটি সূচকের ওপরই ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পূর্বাভাসে বৈশ্বিক অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা উঠে এসেছে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।