প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মায়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নতুন মোড় নিয়েছে দেশটির ক্ষমতার কাঠামো। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল মিন অং হ্লাইং দেশটির নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। রাজধানী নেপিডোতে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক শপথ অনুষ্ঠানে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শপথ গ্রহণের পর দেওয়া ভাষণে মিন অং হ্লাইং বলেন, মায়ানমার গণতন্ত্রের পথে ফিরে এসেছে এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দেশটি এখনো নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সেগুলো মোকাবিলা করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে।
গত সপ্তাহে সামরিকপন্থী সংসদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে মোট তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফলাফলে তিনি শীর্ষে অবস্থান করেন এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীরা পরবর্তীতে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বলে জানানো হয়।
৬৯ বছর বয়সী মিন অং হ্লাইং ২০২১ সালে তৎকালীন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন। ওই সময় থেকেই মায়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংঘাতের সূচনা হয়, যা পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক প্রতিবাদ, অসহযোগ আন্দোলন এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলন সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হয়। এর জবাবে সেনাবাহিনী কঠোর দমন-পীড়ন চালায়, যা দেশটিকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আঞ্চলিক জোট আসিয়ান থেকে মায়ানমারকে কার্যত বহিষ্কৃত অবস্থায় যেতে হয়।
নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মিন অং হ্লাইং তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মায়ানমার আসিয়ানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায় এবং স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করবে। শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী দেশ চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ প্রায় ২০টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
তবে এই নির্বাচন ও শপথ গ্রহণকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো ইতিবাচকভাবে দেখছে না। গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থা এই প্রক্রিয়াকে প্রহসনমূলক বলে মন্তব্য করেছে। তাদের মতে, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচন ছিল একপেশে এবং এতে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সীমিত ছিল।
নির্বাচনে সেনাবাহিনী-সমর্থিত দল ভূমিধস বিজয় অর্জন করে, যা পশ্চিমা দেশগুলো এবং সমালোচক মহল সন্দেহের চোখে দেখছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যেখানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেখানে ভোটগ্রহণই হয়নি। ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে মায়ানমারের অনেক অঞ্চল কার্যত ভোট প্রক্রিয়ার বাইরে ছিল। এতে করে নতুন সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মায়ানমারের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হয়েছে। অং সান সু চির দল এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী একত্র হয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীও কঠোর সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে দেশজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, বহু মানুষ নিহত হয়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে অন্তত ৩৬ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
মানবিক পরিস্থিতিও দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশু ও নারী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিন অং হ্লাইংয়ের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ মায়ানমারের রাজনৈতিক সমাধানের পথে কোনো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনবে না। বরং চলমান সংঘাত ও আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, মায়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। নতুন সরকারের ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।