প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান। ইরান থেকে চীনের তেল আমদানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরানি তেলবাহী চীনা ট্যাংকারগুলো হরমুজ প্রণালিতে আটকে দেওয়া হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বেসেন্ট বলেন, চীন ইরান থেকে তেল পাবে না এবং তাদের অন্য উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে। তার এই মন্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান মূলত ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালিতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলো আটকে দেয়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও উত্থাপন করতে পারে।
স্কট বেসেন্ট তার বক্তব্যে চীনের ভূমিকাও কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইরানের তেলের বড় ক্রেতা হিসেবে চীন বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। তার অভিযোগ, চীন একদিকে তেলের মজুত বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের রপ্তানি সীমিত করছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। তিনি আরও জানান, এই বিষয়ে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে, তবে এখনো কোনো সমাধান আসেনি।
চীন বরাবরই ইরানের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বজায় রেখে আসছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন উপায়ে ইরান থেকে তেল আমদানি করে থাকে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই হুঁশিয়ারি কার্যকর হলে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে, রাশিয়াও ইতোমধ্যে চীনের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে বিকল্প জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বেইজিং সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এই সফরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি না— সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি বেসেন্ট। তিনি শুধু বলেন, এই সফরের মূল বার্তা হওয়া উচিত স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রাখা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক বর্তমানে এক জটিল পর্যায়ে রয়েছে। বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব— সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক বহুস্তরীয় চ্যালেঞ্জের মুখে। এর সঙ্গে ইরানের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। ইরান ইতোমধ্যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। তাদের প্রধান ক্রেতা দেশগুলোর একটি চীন যদি তেল আমদানে বাধার মুখে পড়ে, তাহলে ইরানের অর্থনীতিতে আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা বাড়তে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরতা— এসব বিষয় সামনে চলে আসতে পারে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ তারা সাধারণত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলও হতে পারে। বাস্তবে হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি ট্যাংকার আটকে দেওয়া একটি জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ, যা আন্তর্জাতিক সংঘাতের রূপ নিতে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত এই ইস্যুটি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের দিকে যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ইরান থেকে চীনের তেল আমদানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাধা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এটি শুধু একটি জ্বালানি ইস্যু নয়, বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের একটি অংশ। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনা, আন্তর্জাতিক আইন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসী নজর রাখছে এই সংকটের দিকে। কারণ এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর। ভবিষ্যতে এই ইস্যু কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।