প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও গাজা যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালি। গত মঙ্গলবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে নতুন আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০০৫ সালে কার্যকর হওয়া এই প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ইতালি ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারিত্ব, সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয় এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের কাঠামো তৈরি হয়েছিল। চুক্তিটি প্রতি পাঁচ বছর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হওয়ার কথা ছিল, যদি না কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায়।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজা ও আশপাশের অঞ্চলে চলমান সংঘাত এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ইতালির অভ্যন্তরেও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তীব্র হয়ে ওঠে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চুক্তি স্থগিতের দাবি জোরালো হতে থাকে।
ইতালির সংসদ সদস্য এবং গ্রিন ইউরোপ পার্টির মুখপাত্র অ্যাঞ্জেলো বোনেল্লি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত মূলত সাম্প্রতিক একটি গুরুতর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে, যেখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে থাকা ইতালীয় সদস্যরা ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার শিকার হন। তার মতে, এই ঘটনার পর সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গত কয়েক বছর ধরেই তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক চুক্তি পুনর্বিবেচনার জন্য। তার দাবি অনুযায়ী, গাজায় চলমান সংঘাতে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে নারী ও শিশুর প্রাণহানির ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার এই চুক্তিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিষয় নয়, বরং এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে চলমান নীতিগত বিতর্কেরও প্রতিফলন। অনেক দেশই এখন মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়তে থাকায় ইউরোপীয় রাজনীতিতে ইসরায়েল নীতি নিয়ে ভিন্নমত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চুক্তি স্থগিতের প্রক্রিয়া শুরু হয় সোমবার, যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেটো ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। এরপর মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মেলোনি এক সরকারি অনুষ্ঠানে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এই চুক্তির স্বয়ংক্রিয় নবায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বহীন বলে দাবি করে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই চুক্তি বাস্তবে খুব সীমিত পরিসরে কার্যকর ছিল এবং এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো বড় প্রভাব ফেলবে না। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন, ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অস্ত্র বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এটি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর নীতিগত অবস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে মানবাধিকার ও শান্তিপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, অন্যদিকে কিছু রাজনৈতিক মহল মনে করছে এটি কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। এমন অবস্থায় একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্থগিত করা কেবল রাজনৈতিক বার্তাই দেয় না, বরং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলে।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্থগিতের মাধ্যমে ইতালি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্যে নতুন আলোচনার সূচনা করবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।