উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও ধীরগতি আর সহ্য নয়: সাকী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, ধীরগতি এবং অনিয়মের সংস্কৃতি আর সহ্য করা হবে না বলে কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকী। তিনি বলেছেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আর গতানুগতিক ধারায় চলতে দেওয়া হবে না, বরং প্রতিটি প্রকল্পকে সময়, গুণগত মান এবং স্বচ্ছতার মানদণ্ডে কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের কার্য-অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বর্তমান চিত্র, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সরকার এখন উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রকল্প বছরের পর বছর ধরে চলমান থেকেও শেষ হয়নি, কিংবা বারবার ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই সংস্কৃতি ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, “২০১৭ সালের প্রকল্প এখনো চলমান থাকা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার বড় উদাহরণ। এটি আর চলতে দেওয়া হবে না।”

প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহার এবং ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির আলোকে একটি নতুন কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করছে। এই কাঠামোর লক্ষ্য হচ্ছে দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা, বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। দুই বছরের একটি বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই রূপান্তর কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির অর্থ ব্যয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। প্রতিটি প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে দুর্নীতি ও অর্থ অপচয় রোধে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এখন থেকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা ব্যয় নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত প্রভাবকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। নতুন প্রতিটি প্রকল্প কতজন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করবে, সেটি এখন মূল বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এই লক্ষ্য অর্জনে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে আরও দক্ষ, টেকসই এবং বাস্তবভিত্তিক হতে হবে।

ডিসি সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব ও সুপারিশের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, আর্থিক বরাদ্দের সময়সূচির সমস্যা, প্রকল্প পর্যবেক্ষণ দুর্বলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়ম নিয়ে মাঠ প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মতামত এসেছে। সরকার এসব সমস্যার সমাধানে একটি সুসংগঠিত অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করছে।

তিনি জানান, উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়াতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে (আইএমইডি) আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকেও (এসআইডি) আধুনিকায়ন করা হচ্ছে, যাতে রিয়েল টাইম তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘ভ্যালু ফর মানি’ নীতিকে আরও শক্তভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, উন্নয়ন আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জনগণের জীবনমান উন্নয়নে প্রকল্পগুলোকে বাস্তব প্রভাব ফেলতে হবে। এজন্য প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ডিসি সম্মেলনের আলোচনায় আরও উঠে আসে উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত মনিটর করা হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে তার কারণ বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে একটি আধুনিক, দক্ষ এবং জনবান্ধব ব্যবস্থায় রূপান্তর করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। জনগণের করের টাকা যেন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, সেটি নিশ্চিত করাই হবে প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও গতি ফিরে আসবে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে দূর হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় নতুন বার্তা দিচ্ছে। তবে বাস্তবে এর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত